২১০০ সালের মধ্যে যে হিমবাহ সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়াতে পারে ১.২ ইঞ্চি

অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলছে, আর সেই বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে প্রতিনিয়তই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিজ্ঞানীরা। এবার বিশ্বের অন্যতম আলোচিত হিমবাহ থোয়েটস গ্লেসিয়ার নিয়ে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এর বরফ গলার প্রক্রিয়া আগের ধারণার চেয়ে বেশি জটিল এবং দ্রুতগতির হচ্ছে।
থোয়েটস গ্লেসিয়ারকে বলা হয় ডুমসডে গ্লেসিয়ার (Doomsday Glacier)। কারণ, এই বিশাল হিমবাহের বরফ গলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমন একটি প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিয়েছেন, যেখানে সমুদ্রের পানি হিমবাহের নিচে প্রবেশ করে বরফ গলাতে সাহায্য করছে।
২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর Nature Communications সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, নতুন মডেল অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে থোয়েটস গ্লেসিয়ার একাই বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা প্রায় ৩০ মিলিমিটার বা ১.২ ইঞ্চি বাড়াতে পারে। এটি আগের কিছু হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ। তবে এটি একটি মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ না।
থোয়েটস গ্লেসিয়ারকে ডুমসডে গ্লেসিয়ার বলা হয় কেন
থোয়েটস গ্লেসিয়ার পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত একটি বিশাল হিমবাহ। এর আয়তন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই হিমবাহের বরফ কমছে এবং এর প্রবাহ ও পিছু হটার গতি নিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
হিমবাহটির গুরুত্ব শুধু এর নিজের বরফের পরিমাণে সীমাবদ্ধ না। এটি পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তরের একটি বড় অংশকে সমুদ্রের দিকে দ্রুত সরে যাওয়া থেকে আটকে রাখতেও ভূমিকা রাখে। ফলে থোয়েটস দুর্বল হয়ে পড়লে আশপাশের বরফস্তরের স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, থোয়েটস গ্লেসিয়ারের সব বরফ গলে গেলে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার বা দুই ফুটের কাছাকাছি বাড়তে পারে। আর এর পিছু হটার ফলে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার আরও বড় বরফস্তর অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরও অনেক বেশি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই সম্ভাব্য প্রভাবের কারণেই হিমবাহটিকে ডুমসডে গ্লেসিয়ার নামে ডাকা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে হিমবাহটি শিগগিরই পুরোপুরি ধসে পড়বে। বিজ্ঞানীদের মতে, এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বরফের গঠন, সমুদ্রের তাপমাত্রা এবং বরফের নিচের ভূমির প্রকৃতির ওপর।
নতুন গবেষণায় কী জানা গেছে?
আগের অনেক বরফস্তর মডেলে হিমবাহের যে অংশ সমুদ্রের তলায় ভূমির সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং যে অংশ সমুদ্রে ভাসতে শুরু করে, তাদের মাঝের সীমানাকে তুলনামূলক সরু রেখা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এই সীমানাকে বলা হয় গ্রাউন্ডিং লাইন।
কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বাস্তবে এই পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট রেখা বরাবর ঘটে না। বরং কয়েক কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত একটি অঞ্চল থাকতে পারে, যেখানে জোয়ার-ভাটার সঙ্গে বরফ ওঠানামা করে এবং সমুদ্রের পানি বরফের নিচে প্রবেশ করে।
গবেষকেরা এই অঞ্চলকে গ্রাউন্ডিং জোন বা বরফের ভিত্তি পরিবর্তনের অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নতুন মডেলে এই অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে থোয়েটস গ্লেসিয়ারের গত কয়েক দশকের বরফ পাতলা হওয়া, দ্রুত প্রবাহ এবং পিছু হটার তথ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়া বিবেচনায় নিলে হিমবাহের ভবিষ্যৎ বরফক্ষয় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য হিসাব আগের তুলনায় বেশি হয়।
হিমবাহের নিচে সমুদ্রের পানি কীভাবে বরফ গলাচ্ছে?
থোয়েটস গ্লেসিয়ারের যে অংশ সমুদ্রের তলায় ভূমির সঙ্গে যুক্ত, সেই অংশের কাছে সমুদ্রের পানি প্রবেশ করতে পারলে বরফের নিচের অংশ গলতে পারে। জোয়ার-ভাটার প্রভাবে বরফ কিছুটা ওপরে ওঠে ও নিচে নামে। এর ফলে সমুদ্রের পানি বরফের নিচে ঢুকতে ও বেরিয়ে যেতে পারে।
এই প্রক্রিয়াকে জোয়ার-ভাটাজনিত পানি চলাচল বা টিডাল পাম্পিং বলা হয়।
সমুদ্রের তুলনামূলক উষ্ণ পানি বরফের নিচে প্রবেশ করলে গলনের পরিমাণ বাড়তে পারে। এর ফলে হিমবাহের নিচের অংশে ভূমির সঙ্গে বরফের সংযোগ দুর্বল হয়। বরফের নিচে যে ঘর্ষণ ও প্রতিরোধ হিমবাহের প্রবাহকে ধীর করে রাখে, সেটিও কমে যেতে পারে।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, এই প্রক্রিয়াকে মডেলে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে থোয়েটস গ্লেসিয়ারের অতীতের পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বরফক্ষয় আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ কতটা বাড়তে পারে?
গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, থোয়েটস গ্লেসিয়ার থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের কিছু হিসাবের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
নতুন মডেল অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে এই হিমবাহ বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা প্রায় ৩০ মিলিমিটার বা ১.২ ইঞ্চি বাড়াতে পারে। গবেষণায় এর সম্ভাব্য পরিমাণের অনিশ্চয়তাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রায় ৩০ ± ৬ মিলিমিটার।
এই পূর্বাভাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গবেষকদের মডেলে অতিরিক্ত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি না ধরলেও এই মাত্রার সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, হিমবাহের নিচে বরফ গলার প্রক্রিয়া ও ইতিমধ্যে শুরু হওয়া পরিবর্তন ভবিষ্যতের বরফক্ষয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই সংখ্যা থোয়েটস গ্লেসিয়ারের সম্ভাব্য অবদান। এটি বিশ্বের সব হিমবাহ ও বরফস্তর গলে সমুদ্রপৃষ্ঠ যতটা বাড়বে, তার মোট হিসাব নয়।
২০৩৮ সালের মধ্যেই কি হিমবাহের বড় পরিবর্তন হতে পারে?
গবেষণায় থোয়েটস গ্লেসিয়ারের নিচে থাকা সমুদ্রতলের উঁচু অংশগুলোর ভূমিকাও উঠে এসেছে। এই উঁচু অংশগুলো অনেকটা প্রাকৃতিক বাধার মতো কাজ করে, যা হিমবাহের বরফকে দ্রুত সমুদ্রের দিকে সরে যাওয়া থেকে আটকে রাখে।
নতুন মডেল অনুযায়ী, গ্রাউন্ডিং জোনে বরফ গলার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে হিমবাহের একটি অংশ সমুদ্রতলের এমন একটি বাধা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। গবেষণার হিসাবে, এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া ২০৩৮ সালের দিকেও শুরু হতে পারে।
বাধাটি সরে গেলে হিমবাহের বরফ আরও দ্রুত পিছু হটার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ২০৩৮ সাল কোনো নিশ্চিত ধসের তারিখ নয়। এটি মডেলে পাওয়া সম্ভাব্য সময়সীমার একটি অংশ। বাস্তবে পরিবর্তনের গতি নির্ভর করবে বরফের নিচের ভূপ্রকৃতি, সমুদ্রের অবস্থা এবং অন্যান্য প্রক্রিয়ার ওপর।
সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়লে কী প্রভাব পড়তে পারে?
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাস, উচ্চ জোয়ার ও উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই মাত্রার ঝড়ও তখন আগের তুলনায় বেশি দূর পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে। নিচু উপকূলীয় এলাকা, দ্বীপ এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহর বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে।
বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা, নদী ও মোহনার সঙ্গে মানুষের বসতি, কৃষি এবং জীবিকা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে উপকূলীয় প্লাবন, লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ এবং ভাঙনের মতো সমস্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তবে বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কতটা প্রভাব পড়বে, তা শুধু থোয়েটস গ্লেসিয়ারের এই গবেষণা দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, ভূমির উচ্চতা, নদীর প্রবাহ, জোয়ার-ভাটা, ঘূর্ণিঝড় এবং উপকূলীয় ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞানীরা কি নিশ্চিত যে থোয়েটস গ্লেসিয়ার ধসে পড়বে?
না। নতুন গবেষণাটি হিমবাহের বরফ গলার প্রক্রিয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য অবদান নিয়ে আগের চেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ দেখিয়েছে। কিন্তু এর ভিত্তিতে বলা যায় না যে হিমবাহটি নির্দিষ্ট কোনো বছরে সম্পূর্ণ ধসে পড়বে।
গবেষকেরা নিজেরাও জানিয়েছেন, বরফের নিচের পরিবেশ সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন। থোয়েটস গ্লেসিয়ারের নিচে সরাসরি পরিমাপ করা কঠিন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে স্যাটেলাইটের তথ্য ও কম্পিউটার মডেলের ওপর নির্ভর করতে হয়।
গবেষণায় ব্যবহৃত মডেল ভবিষ্যৎ অনুমান করতে সাহায্য করে, কিন্তু মডেলের ফলাফল বাস্তবের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে পূর্বাভাস যাচাই করা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কী করা জরুরি?
হিমবাহের বরফ গলার কিছু পরিবর্তন দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি সীমিত করা গেলেও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার প্রভাব একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়।
তবে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো ভবিষ্যতের উষ্ণতা ও দীর্ঘমেয়াদি বরফক্ষয়ের ঝুঁকি সীমিত করতে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকি মূল্যায়ন, আগাম সতর্কতা, টেকসই অবকাঠামো এবং জলবায়ু অভিযোজনের পরিকল্পনা জোরদার করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি এক দিনে তৈরি হয় না, তাই প্রস্তুতিও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি।
থোয়েটস গ্লেসিয়ার নিয়ে নতুন গবেষণা দেখিয়েছে, হিমবাহের নিচে সমুদ্রের পানি প্রবেশ ও বরফ গলার প্রক্রিয়া আগের মডেলগুলোতে যতটা গুরুত্ব পেয়েছিল, বাস্তবে তার প্রভাব আরও বেশি হতে পারে। ফলে ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে এই হিমবাহের অবদান আগের হিসাবের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে।
তবে গবেষণাটি কোনো নিশ্চিত ধসের ঘোষণা নয়। বরং এটি বিজ্ঞানীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যাতে হিমবাহের নিচের প্রক্রিয়া আরও ভালোভাবে বোঝা যায় এবং ভবিষ্যতের সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির পূর্বাভাস উন্নত করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানো এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখার প্রস্তুতি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়।
তথ্যসূত্র
Nature Communications, গবেষণাপত্র
International Thwaites Glacier Collaboration
National Public Radio (NPR), থোয়েটস গ্লেসিয়ার ও সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির গবেষণা