নেপাল-চীনে নিহত বেড়ে ৬২৩, শত শত মরদেহ শনাক্তের উপায় নেই

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। একই দুর্যোগে চীনের নিয়ন্ত্রিত তিব্বত অঞ্চলে আরও সাতজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে দুই অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা অন্তত ৬২৩ জন হলেও, দুই পক্ষের হিসাবে কোনো নামের পুনরাবৃত্তি আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
শনিবার (২৯ আগস্ট) স্থানীয় পুলিশ ও চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
নেপালে এখনো প্রায় দুই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে তিব্বতের গিরং এলাকায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৫৫৪ বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। ফলে উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপালের দক্ষিণ-মধ্য তেরাই অঞ্চলের চিতওয়ান জেলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যার পর এ পর্যন্ত ২৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র চারজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
চিতওয়ান জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হাসপাতাল ও নদীর তীর থেকে উদ্ধার করা মরদেহ ও দেহাবশেষ পচন ধরায় সেগুলো আর চেনার উপায় নেই।
বাকি ২২৯টি মরদেহ বিভিন্ন সংরক্ষণকেন্দ্র ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রাখা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ চলছে।
ভয়াবহ বন্যায় নুয়াকোট জেলার দেবীঘাট এলাকার চিত্রও বদলে গেছে। ত্রিশূলী ও কালীগণ্ডকী নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত এই এলাকা নেপালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।
বন্যার কয়েক দিন পরের ড্রোন ও স্থিরচিত্রে দেখা গেছে, একসময় রঙিন বাড়িঘরে ভরা এলাকাটি এখন কাদা ও ধ্বংসস্তূপে ঢাকা। ভেঙে গেছে সেতু, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি ও যোগাযোগব্যবস্থা।
স্যাটেলাইট চিত্রেও দুর্যোগের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়েছে। নেপালের তিমুরে বন্যার আগে নদীর তীরে থাকা অসংখ্য ভবন ও সড়কের বেশির ভাগই এখন কাদা, পানি ও পাথরের নিচে চাপা পড়েছে। ত্রিশূলী নদীর তীরে থাকা রাসুওয়াগাড়ি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রেরও কার্যত কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রকাশিত ভিডিওতে তিব্বতের গিরং এলাকায় উদ্ধার অভিযানের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। দুর্গম পাহাড়ি পথ, কাদামাটি, পাথর ও প্রবল স্রোত পেরিয়ে উদ্ধারকারীরা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন।
লাসার একটি অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার দলের নেতা জৌ মিংছি বলেন, সীমান্ত এলাকার পুরোনো গেটের আশপাশে পুরু কাদায় পুরো এলাকা ঢেকে গেছে। কোথাও কোথাও মাটিতে পা দিলেই তা ডুবে যাচ্ছে।
গিরং বন্দর নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে পর্যটক ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথ। স্যাটেলাইট ছবিতে এলাকাটি প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে।
উদ্ধারকর্মীদের জন্য পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার ভূতত্ত্ববিদ ড. আলেনা গিয়েশে বলেছেন, প্রাথমিক বন্যার পর জমে থাকা ধ্বংসাবশেষের অন্তত একটি অংশ থেকে আবার পানি বের হতে দেখা যাচ্ছে।
ফলে নতুন করে কাদা, পাথর ও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধারকারীরা যেসব এলাকায় কাজ করছেন, সেখানেও বড় বড় পাথর ও ধ্বংসাবশেষ এখনো অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।
তার মতে, হিমালয় অঞ্চল স্বাভাবিকভাবেই ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল। এর সঙ্গে এখন বরফ গলার মৌসুম এবং বর্ষাকাল—দুটিই চলছে। বৃষ্টিপাত ও বরফ গলার এই দুই প্রক্রিয়া হিমবাহ ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে তিব্বতে ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট একটি জলাধারে আবারও পানির উচ্চতা বাড়ছে বলে জানিয়েছে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে উদ্ধারকারীরা ড্রোন ও পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ব্যবহার করছেন এবং সম্ভাব্য নতুন ভূমিধসের বিষয়ে আগাম সতর্কতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দুর্যোগের পর নেপালে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করেছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। জাতিসংঘ জানিয়েছে, দেশটির ১০ হাজারেরও বেশি পরিবারের খাদ্য ও নিরাপদ পানির প্রয়োজন।
এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে নেপালি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র নেপালের জন্য জরুরি সহায়তা ও ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনও তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা হিসেবে ২০ লাখ ইউরো দেওয়ার ঘোষণা করেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, দুই দেশের মানুষ একসঙ্গে এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠে দ্রুত ঘরবাড়ি পুনর্গঠন করতে পারবেন।
তবে আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় নেপাল ও তিব্বতে উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধান কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

