হরমুজে লেজার অস্ত্র মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের, নিয়ন্ত্রণে ভিডিও গেমের এক্সবক্স কন্ট্রোলার

যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে হুমকি মোকাবিলায উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন অত্যাধুনিক লেজার অস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। দীর্ঘদিনের গবেষণা ও পরীক্ষার পর লেজার প্রযুক্তি এখন পরীক্ষাগারের গণ্ডি পেরিয়ে সামরিক ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে এই শক্তিশালী লেজার অস্ত্র মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সন্দেহজনক ড্রোন ধ্বংসের এই অস্ত্র পরিচালনায় ভিডিও গেমের পুনর্গঠিত এক্সবক্স কনসোল কন্ট্রোলার ব্যবহার করছে মার্কিন সেনারা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ বিভাগ বা ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধ বিভাগ থেকে জানানো হয় যে, প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের মতো দামি গতিশীল ক্ষেপণাস্ত্রের জায়গায় অনেক কম খরচে ড্রোন ও ধেয়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে লেজার অস্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে দেশটির দক্ষিণ সীমান্তে এর পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, লেজার প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা অন্য সামরিক বাহিনীগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। তবে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে মার্কিন বাহিনী। লেজার অস্ত্রের এই প্রকল্পে প্রায় ৫০ কোটি ডলার ব্যয় করছে যুক্তরাষ্ট্র।
লেজার অস্ত্রগুলো জেনারেটর বা ব্যাটারি প্যাক থেকে শক্তি গ্রহণ করে। সেই শক্তি ফোটনে রূপান্তরিত হয়। পরে এসব আলোক কণাকে একটি কেন্দ্রীভূত রশ্মিতে পরিণত করা হয়, যা লক্ষ্যবস্তুর নির্দিষ্ট অংশে প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে ড্রোনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করা বা পুরো ড্রোন ধ্বংস করা সম্ভব হয়।
ডিরেক্টেড এনার্জি কনসালট্যান্টসের প্রেসিডেন্ট মার্ক নাইসকে উদ্ধৃত করে দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছে, লেজার ব্যবহার করে খুব নির্ভুলভাবে ড্রোন শনাক্ত, অনুসরণ ও লক্ষ্যবস্তু করা যায়। এর মাধ্যমে ড্রোনের সেন্সর অকার্যকর করা কিংবা পুরো ড্রোন ধ্বংস করা সম্ভব।
এক্সবক্স কনসোল দিয়ে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ
আশ্চর্যজনকভাবে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কিছু লেজার অস্ত্র এক্সবক্সের মতো গেম কনসোলের কন্ট্রোলার দিয়ে পরিচালনা করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীর যুক্তি হলো, গেমিং শিল্প যখন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলেছে, তখন নতুন করে একটি বিশেষায়িত কন্ট্রোলার তৈরির প্রয়োজন নেই। প্রচলিত গেম কন্ট্রোলার দিয়েই যদি একই কাজ করা যায়, তাহলে সেটিই ব্যবহার করা যেতে পারে।
বোয়িংয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাদের কমপ্যাক্ট লেজার ওয়েপন সিস্টেম বা সিএলডব্লিউএস এক্সবক্স কন্ট্রোলার ব্যবহার করে পরিচালনা করা যায়। সামরিক অপারেটররা মাত্র এক ঘণ্টার প্রশিক্ষণ নিয়েও সিস্টেমটি পরিচালনা করতে পেরেছেন।
‘লেজার ওয়ার্স’ নিউজলেটারের উদ্যোক্তা জ্যারেড কেলারের মতে, লেজার অস্ত্রকে শুধু পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পরিবেশে ব্যবহার করার এখনই সময়। এক্সবক্স কন্ট্রোলার ব্যবহারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হ্যালো’ গেমে স্পার্টান লেজার ব্যবহার করে থাকলে বাস্তব জীবনেও এ ধরনের অস্ত্র পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।
মেক্সিকো থেকে মধ্যপ্রাচ্য
মার্কিন সামরিক বাহিনী বিভিন্ন পরিবেশে লেজার প্রযুক্তি পরীক্ষা ও মোতায়েন করছে। বোয়িংয়ের সিএলডব্লিউএস ২০২৪ সালে সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ মহড়ায় গ্রুপ ৩ শ্রেণির বড় ড্রোন ধ্বংস করে। ৫ কিলোওয়াটের লেজার ব্যবহার করে ওই ড্রোনগুলোকে প্রতিহত করা হয়। ২০২৬ সালে মার্কিন বিমানবাহিনীও ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় সিএলডব্লিউএস মোতায়েন ও পরীক্ষা করার কথা জানিয়েছে। তবে নিরাপত্তার কারণে সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন নৌবাহিনীর হাই এনার্জি লেজার উইথ ইন্টিগ্রেটেড অপটিক্যাল ড্যাজলার অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স বা ‘হেলিওস’ আলাদা একটি ব্যবস্থা। এটি যুদ্ধজাহাজে স্থাপন করা হয়েছে এবং ড্রোন, ছোট নৌযান ও বিভিন্ন নজরদারি সেন্সর মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
মার্কিন ফরেন পলিসি কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা অধ্যয়নের জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্রেন্ট জিয়ারনিক নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, লেজার অস্ত্রে পর্যাপ্ত শক্তি সরবরাহ করা গেলে এটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে। এতে প্রচলিত গোলাবারুদের মজুতের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে এবং সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে লেজার অস্ত্রের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এগুলোর কার্যকারিতা আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে। পাশাপাশি একসঙ্গে অনেক ড্রোনের হামলা হলে প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুতে পর্যাপ্ত সময় ধরে লেজার ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এ কারণে লেজারকে প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিকল্পের বদলে প্রতিরক্ষার একটি অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

