মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বিশ্বশান্তির বার্তা দিচ্ছে: এরদোয়ান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি একটি ভিন্নধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছে। তার মতে, বিশ্বকে শান্তির গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই চুক্তি একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি করেছে।
আলজাজিরা আরবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান এসব কথা বলেন। গত ১৪ আগস্ট ধারণ করা সাক্ষাৎকারটি তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একে পার্টি) ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন প্রচার করা হয়। সেখানে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেন।
মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পর্কে এরদোয়ান বলেন, প্রথমত, মক্কা চুক্তি একটি ভিন্নধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
তিনি বলেন, মক্কায় তিন দেশের এই চুক্তি বিশ্বকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। একই জায়গায় তিন দেশের একসঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানো তাদের আরও শক্তিশালী করেছে এবং বিশ্ববাসীর কাছে আলাদা একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
এরদোয়ান বলেন, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব—তিন দেশই অত্যন্ত সন্তুষ্টির সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের কঠিন সময়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি বিশ্বশান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা বহন করছে।
তিনি বলেন, তুরস্ক শান্তির পক্ষে থাকা একটি দেশ। মক্কাকে চুক্তির স্থান হিসেবে বেছে নেওয়াও শান্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের সময় তুরস্ক সবসময় শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলেও জানান এরদোয়ান। তিনি বলেন, শান্তির পক্ষে কাজ করা দেশ হিসেবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব শান্তির পক্ষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে এবং ভবিষ্যতেও এই পথেই থাকবে।
যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
মক্কা চুক্তিটি ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এরদোয়ান বলেন, ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে যেমন যৌথ প্রতিরক্ষার বিষয়টি রয়েছে, তেমনি এই চুক্তির আওতায় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে বাকি দেশগুলো একসঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
তিনি বলেন, তুরস্ক, সৌদি আরব বা পাকিস্তানের যেকোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে তিন দেশই একে অপরকে রক্ষায় এগিয়ে আসতে পারবে।
এরদোয়ান আরও বলেন, ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোও এই চুক্তিতে যোগ দিতে পারবে। এটি শুধু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো দেশ যোগ দিতে চাইলে তাদের জন্য দরজা খোলা থাকবে।
মিসর চাইলে দেশটিকেও এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত করার বিষয়ে তিন দেশ আলোচনা করতে পারে বলে জানান তিনি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ প্রসঙ্গে এরদোয়ান জানান, তার প্রত্যাশা যত দ্রুত সম্ভব শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
তিনি বলেন, যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো, সেটি বন্ধ থাকায় নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই জলপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং বিশ্বে তেল সরবরাহ নির্বিঘ্ন করা প্রয়োজন।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিনামূল্যে ও অবাধে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির জন্য তা আরও উপযুক্ত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলা সম্পর্কে তুরস্কের অবস্থান জানতে চাইলে এরদোয়ান বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই যুদ্ধের পক্ষে নই।’
তিনি বলেন, তুরস্ক শান্তির পক্ষে। তবে এই যুদ্ধের পেছনে ইসরায়েলই প্রধান ভূমিকা পালন করছে।
তার অভিযোগ, ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধকে উৎসাহিত করেছে এবং যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে। এর ফলে অনেক দেশকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে।
দামেস্ক সফরের পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগের প্রশংসা করেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, দুই দেশই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে এবং ভবিষ্যতেও তারা এ ভূমিকা অব্যাহত রাখবে বলে তিনি আশা করেন।
মুসলিম দেশগুলোর ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার আহ্বানও জানান তিনি।
সিরিয়ার নতুন প্রশাসন ও প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক নিয়ে এরদোয়ান বলেন, সিরিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। সিরিয়াকে তিনি ‘ভাই’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তুরস্ক কখনো সিরিয়াকে একা ছেড়ে যাবে না।
সিরিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য তুরস্ক যা করার প্রয়োজন, তা করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট শারা ও তার সহকর্মীরা সিরিয়ার জন্য তুরস্ক কী করেছে তা ভালোভাবেই জানেন বলেও মন্তব্য করেন এরদোয়ান।
তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব দামেস্ক সফরের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলার সমালোচনা
লেবাননে ইসরায়েলের চলমান হামলা নিয়েও কথা বলেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, লেবাননের ওপর এসব হামলা তুরস্ককে গভীরভাবে ব্যথিত করছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের তুরস্ক সফরের কথা উল্লেখ করে এরদোয়ান বলেন, লেবাননকে সহায়তার জন্য তুরস্ক তার সামর্থ্যের মধ্যে সবকিছু করে যাবে।
লেবাননে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, লেবাননকে এই ‘আগুনের বলয়’ থেকে বের করে আনতে হবে।
এরদোয়ান বলেন, বর্তমানে ইসরায়েলই আগ্রাসন চালাচ্ছে এবং লেবানন এখনো ধারাবাহিক ইসরায়েলি হামলার শিকার হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব লেবাননকে এসব হামলা থেকে মুক্ত করতে হবে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্ক আলোচনা করেছে এবং ভবিষ্যতেও আলোচনা চালিয়ে যাবে বলে জানান তিনি। তুরস্ক সফরের সময় ট্রাম্পের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানান এরদোয়ান।
গাজাকে একা ছেড়ে দেওয়া যাবে না
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা নিয়ে এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক গাজাকে একা ছেড়ে দিতে পারে না।
গাজার বিষয়ে তুরস্কের ওপর যে দায়িত্ব রয়েছে, তা দেশটি এখন পর্যন্ত পালন করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে বলে জানান তিনি।
গাজায় দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার পাশাপাশি শাসনব্যবস্থা থেকে সরে দাঁড়ানো এবং অস্ত্র ত্যাগের বিষয়ে হামাসের সম্মতির প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, হামাস যতটা আন্তরিকতা ও সংহতি দেখানোর সম্ভব ছিল, তা দেখিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের পক্ষ থেকে একই ধরনের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল লেবানন ও গাজায় হামলা চালিয়ে আগ্রাসী নীতি অব্যাহত রেখেছে।
ইসরায়েল নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তার আলোচনার কথাও উল্লেখ করেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, এসব ঘটনায় ট্রাম্পও উদ্বিগ্ন বলে তার মনে হয়েছে। তুরস্ক প্রয়োজনীয় সব সতর্কবার্তা দিচ্ছে এবং তা অব্যাহত রাখবে।
ইসরায়েলের রাজনীতিক ও গণমাধ্যমে তুরস্কবিরোধী বক্তব্য নিয়েও সতর্ক করেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, কেউ যদি শান্তির পরিবর্তে যুদ্ধের জন্য তুরস্ককে আক্রমণ করতে চায়, তাহলে তুরস্ক ভয় পাবে না বা এমন যুদ্ধ এড়িয়ে যাবে না। তবে তুরস্ক এমন পরিস্থিতি চায় না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
সুদানের সঙ্গে সম্পর্ক
সুদানে ২০২৩ সাল থেকে চলমান গৃহযুদ্ধের বিষয়ে এরদোয়ান বলেন, সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। তবে তুরস্ক সুদানকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
সুদানের সার্বভৌম কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো বলেও জানান এরদোয়ান। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বুরহানকে সুদানের জন্য উপযুক্ত নেতা হিসেবে মনে করেন তিনি।
লিবিয়া প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, দেশটির সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক দৃঢ় রয়েছে। লিবিয়া যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে, তাতে তুরস্ক দেশটিকে একা ছেড়ে যাবে না।
বিশেষ করে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি তুর্কিশ পেট্রোলিয়ামের মাধ্যমে লিবিয়ার তেলসম্পদ যৌথভাবে উন্নয়নে তুরস্ক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তা অব্যাহত রাখবে বলে জানান তিনি।
এফ-৩৫ নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান নিয়ে ট্রাম্প যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে তুরস্ক।
তিনি বলেন, এফ-৩৫ নিয়ে ট্রাম্প তুরস্ককে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।
তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পের পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ও রয়েছে বলে জানান তিনি।
ইসরায়েল তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আলোচনায় কোনো বিষয় নয় বলেও স্পষ্ট করেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, তুরস্কের আলোচনার অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র এবং এসব বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই আলোচনা করা হবে।
রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক
রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক ভালো বলে উল্লেখ করেন এরদোয়ান। নিয়মিত ফোনালাপের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, ইউরোপ ৫৩ বছর ধরে তুরস্ককে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও তা করার আগ্রহ আছে বলে মনে হচ্ছে না।
তবে তুরস্কের দরজা এখনো বন্ধ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, তার দেশ এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে চায়।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়া এখন তুরস্কের প্রধান অগ্রাধিকার নয় বলেও মন্তব্য করেন এরদোয়ান। তার মতে, তুরস্ককে প্রত্যাখ্যান করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা ও জাতীয় ঐক্যের কথা উল্লেখ করে আরব বিশ্বের সঙ্গে সংহতি জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
