logo

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে জয়ের পথে উগ্র ডানপন্থীরা

সিএনএন
সিএনএন
জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে জয়ের পথে উগ্র ডানপন্থীরা
জার্মানির ম্যাগডেবার্গে একটি নির্বাচরি অনুষ্ঠানে প্রথম ফলাফল ঘোষণার পর এএফডি দলের সদস্যরা উল্লাস করছেন। ছবি: এপি

জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে জয়ের পথে উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)। রোববারের নির্বাচনে দলটি প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে বলে বুথফেরত জরিপে জানা গেছে। তবে রাজ্য সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তারা পেয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

Advertisement

এই জয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কোনো রাজ্যে উগ্র ডানপন্থী একটি দলের ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছানোর বিরল ঘটনা। ফলাফলটি দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে এএফডির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ক্ষমতাসীন জোটের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষেরও প্রতিফলন বলে দেখা হচ্ছে।

স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে এএফডি চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের রক্ষণশীল দলকে বড় ব্যবধানে পেছনে ফেলেছে। ভোট গণনা চলতে থাকায় এএফডি রাজ্য পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পেয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারলে জার্মানির রাজ্য পর্যায়ে তাদের প্রথম বড় রাজনৈতিক ঘাঁটি হবে। এর মাধ্যমে অভিবাসন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা কমানো এবং ইউরো মুদ্রা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো নীতির পক্ষে আরও জোরালোভাবে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পাবে দলটি।

এএফডির প্রধান প্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ড ফলাফলকে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ম্যাগডেবুর্গে দলটির সমর্থকেরা উল্লাস করেন। জার্মানির পতাকা হাতে নিয়ে তারা বিজয় উদযাপন করেন।

জিগমুন্ড বলেন, এই ফলাফল জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গেও ‘বাস্তবসম্মত কূটনীতি’ অনুসরণের পক্ষে জনগণের সমর্থনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এএফডির সহ-নেতা অ্যালিস ভাইডেলও ফলাফলকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে মন্তব্য করেছেন।

স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনের ফল চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে তার সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কার এবং তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ছে।

জার্মানির এআরডি সম্প্রচারমাধ্যমের একটি জরিপে দেখা গেছে, রাজ্যটির ৮৭ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট। জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চের প্রেসিডেন্ট মার্সেল ফ্রাটশার রয়টার্সকে বলেন, এই নির্বাচনের ফল মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর অনাস্থার প্রকাশ।

মের্জ জার্মানির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যবসাবান্ধব সংস্কার ও সরকারি ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছিলেন, স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির জয় রাজ্যটির ক্ষতি করতে পারে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সেখানে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এএফডির সঙ্গে জোট বা সরকার গঠনে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার স্থানীয় শাখা দলটিকে ডানপন্থী উগ্রবাদী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।

তবে ছোট রাজনৈতিক দল বিএসডব্লিউ পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভোট পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে এএফডির সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে।

সাবেক কমিউনিস্ট শাসিত পূর্ব জার্মানির অংশ স্যাক্সনি-আনহাল্ট তুলনামূলক ছোট একটি রাজ্য। এর জনসংখ্যা ২০ লাখের কিছু বেশি। তবে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এএফডির দ্রুত উত্থানের চিত্র এই নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে।

জাতীয় পর্যায়েও এখন এএফডি জার্মানির সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসেবে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক ইনসা জরিপে দলটির সমর্থন ২৮ শতাংশ, যেখানে রক্ষণশীলদের সমর্থন ২০ শতাংশ।

পূর্বাঞ্চলীয় জার্মানিতে এএফডির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি হলেও পশ্চিমাঞ্চলের সমৃদ্ধ রাজ্যগুলোতেও দলটির সমর্থন বাড়ছে। চলতি বছরের শুরুতে বাডেন-ভুর্টেমবার্গ ও রাইনল্যান্ড-ফালৎসে দলটি প্রায় ২০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।

ইউরোপের অন্যান্য দেশেও উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে নাৎসি আমলের ইতিহাসের কারণে জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এএফডির সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক।

এএফডি তাদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী হওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। দলটির দাবি, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাদের লাখো সমর্থককে অপমান করার শামিল।

নির্বাচনি প্রচারে এএফডি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের হতাশাকে কাজে লাগিয়েছে। দলটি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন শহর এবং জার্মান জাতীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার মতো কঠোর নীতির পক্ষে প্রচার চালিয়েছে।

দলটির নির্বাচনি কর্মসূচিতে স্কুল ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে আরও ‘ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ’ প্রতিষ্ঠা, অভিবাসন কমানো এবং সরকারি সম্প্রচারব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া শরণার্থীদের সন্তানদের জন্য আলাদা শ্রেণিকক্ষ চালু, স্কুলে রংধনু পতাকা নিষিদ্ধ এবং প্রতিদিন সরকারি প্রতিষ্ঠানে জার্মানির জাতীয় পতাকা উত্তোলনের প্রস্তাবও দিয়েছে এএফডি। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাওয়ার পাশাপাশি নাগরিক টহল ব্যবস্থা চালু, স্কুলে রুশ ভাষা শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং নতুন বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধের মতো প্রস্তাবও দলটির কর্মসূচিতে রয়েছে।