logo

২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪.৭ শতাংশে পোঁছানোর শঙ্কা: আইএমএফ

২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪.৭ শতাংশে পোঁছানোর শঙ্কা: আইএমএফ
২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। ছবি: ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস

বিশ্ব অর্থনীতি একের পর এক সংকট সামলে এগিয়ে চললেও প্রবৃদ্ধির গতি কমছে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি ও খাদ্যের বাজারে অস্থিরতা, বাণিজ্য বিরোধ এবং সরকারি ঋণের বোঝা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোজনক্ষমতা অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। ১৩ অক্টোবর থাইল্যান্ডের স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় প্রকাশিত ‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। পরের বছর তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমএফ।

জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে চাপ বেশি

আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতি বিভিন্ন ধাক্কা মোকাবিলা করে টিকে থাকলেও সব দেশ সমানভাবে তা সামলাতে পারছে না। এআই ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিপরীতে, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে কম সম্পৃক্ত দেশগুলো বেশি চাপে পড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব এখনো পুরোপুরি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়নি। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, মজুত ব্যবহার, সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি এআই খাতে বড় বিনিয়োগও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে।

তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন ঘটলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সরকারের ব্যয়ের ওপরও চাপ বাড়বে।

জ্বালানি আমদানিনির্ভর যেসব দেশের প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নেই, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব দেশে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ও আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে। কমে যেতে পারে মানুষের প্রকৃত আয় এবং সংকট মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা।

বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংঘাত ও বাণিজ্য বিরোধে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। এতে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি সরকারি বাজেট ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার আক্রমণ এবং চরম আবহাওয়ার মতো ঘটনাও বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া শুল্ক বৃদ্ধি, বাণিজ্য বিরোধ এবং উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে। ২০২৬ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ২০২৭ সালে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকারি ঋণ অর্থনীতির বড় দুর্বলতা

বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগ সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ। বড় অর্থনীতিগুলোতে ঋণের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জাতীয় নিরাপত্তা খাতে অর্থের চাহিদা বাড়ছে।

ফলে ভবিষ্যতে নতুন কোনো সংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলার জন্য সরকারের হাতে থাকা আর্থিক সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং ঋণকে টেকসই পর্যায়ে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ।

এআই বিনিয়োগে সম্ভাবনা, রয়েছে ঝুঁকিও

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার বাণিজ্যে এ খাত ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

তবে এআই নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ ভবিষ্যতে আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। এ খাতে বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা বা উৎপাদনশীলতা অর্জিত না হলে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। এর ফলে শেয়ারবাজারে দরপতন এবং আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোও এর পরোক্ষ প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, এআই খাতে বিনিয়োগ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার পরামর্শ

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি মোকাবিলায় সরকারগুলোর করণীয় সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম কম রাখতে সবার জন্য ব্যাপক ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সাময়িক এবং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া বেশি কার্যকর।

প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির সময় বাজারদর কৃত্রিমভাবে কম রাখার উদ্যোগে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তুলনায় তিন থেকে ২২ গুণ পর্যন্ত বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় হতে পারে। এ ধরনের ভর্তুকি দীর্ঘমেয়াদে সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিতে পারে।

তাই সংকটের সময় সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারের মূল্যসংকেত বজায় রাখা এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এ জন্য এমন সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের সময় দ্রুত সম্প্রসারণ করা যায়।

করনীতি ও সরকারি বিনিয়োগে ভারসাম্যের প্রয়োজন

করপোরেট আয়কর কমানোর প্রভাব নিয়েও প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে। আইএমএফের মতে, ঋণের অর্থে করছাড় দেওয়া হলে স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে। তবে এর নেতিবাচক প্রভাব অন্য দেশগুলোর অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞান ও প্রযুক্তির আদান-প্রদানের মাধ্যমে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে। কিন্তু কর থেকে সরকারের আয় কমে গেলে অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এ ক্ষেত্রে বেশি সমস্যায় পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সরকারি ঋণের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি নির্ধারণের সময় প্রতিটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গুরুত্ব

ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় জ্বালানির উৎস বহুমুখী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে আইএমএফ। একটি নির্দিষ্ট সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যিক অংশীদারের সংখ্যা বাড়ানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটির মতে, সব ধরনের উৎপাদন নিজ দেশে ফিরিয়ে আনা কিংবা আমদানি বন্ধ করে দেওয়া সংকটের কার্যকর সমাধান নয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরবরাহের নির্ভরতা আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে। বরং বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

আইএমএফের মূল্যায়নে, বিশ্ব অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় সরকারি আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।