হরমুজের পর এবার পানামা খাল ঘিরে মুখোমুখি দুই পরাশক্তি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্বের অন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা পানামা খালও এখন নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করা পানামা খাল বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই খাল দিয়ে বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ পরিচালিত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪০ শতাংশই এই পথ ব্যবহার করে।
হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল কঠিন হয়ে পড়ায় এশিয়ার ক্রেতারা যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি কিনছে। এসব পণ্যের একটি অংশ পানামা খাল হয়ে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে খালটির ওপর চাপও বেড়েছে।
বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিলের (বিমকো) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ নাগাদ পানামা খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতিদিন গড়ে ৩৮টিতে দাঁড়ায়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর পাঁচ সপ্তাহে খালটির ট্রানজিট ১৬ শতাংশ বেড়েছে।
বাড়তি চাহিদার কারণে জাহাজের অপেক্ষার সময় বাড়ছে। একই সঙ্গে পারাপারের বুকিং নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। দ্রুত পারাপারের সুযোগ পেতে কোনো কোনো জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিলামে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিয়েছে বলেও জানা গেছে।
পানামা খাল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ পানামা খালটি পানামার সরু ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। এর ফলে জাহাজগুলোকে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় না। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই কমে।
জাহাজের আকার, ধরন ও বহন করা পণ্যের ওপর নির্ভর করে খাল দিয়ে চলাচলের জন্য ফি দিতে হয়।
খালটি লক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এ ব্যবস্থায় জাহাজকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ওপরে গাতুন হ্রদে তোলা হয় এবং পরে অপর প্রান্তে আবার নিচে নামানো হয়।
তবে এই ব্যবস্থার জন্য বিপুল পরিমাণ মিঠা পানির প্রয়োজন হয়। প্রতিটি জাহাজ পারাপারে গাতুন হ্রদ ও আশপাশের জলাধার থেকে কয়েক মিলিয়ন গ্যালন মিঠা পানি ব্যবহার করা হয়।
এ কারণে পানামা খাল জলবায়ু পরিবর্তন ও খরার ঝুঁকিতেও রয়েছে। পানির স্তর কমে গেলে কর্তৃপক্ষ জাহাজের ড্রাফট সীমিত করতে পারে। এতে জাহাজগুলোকে কম পণ্য বহন করতে হয় এবং খালের সক্ষমতা কমে যায়।
বর্তমানে গাতুন হ্রদের পানির স্তর ঐতিহাসিক গড়ের নিচে রয়েছে। এর কারণে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে খাল দিয়ে প্রতিদিন জাহাজ চলাচলের অনুমোদিত সংখ্যা ৩৬ থেকে কমিয়ে ৩২ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
খাল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বিরোধ কেন?
পানামা খাল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিরোধ মূলত মালিকানা নয়, প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে।
হংকংভিত্তিক সিকে হাচিসন তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান পানামা পোর্টস কোম্পানির মাধ্যমে খালের দুই প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর—বালবোয়া ও ক্রিস্টোবাল—পরিচালনা করে আসছিল। পানামার সঙ্গে করা একটি রেয়াত চুক্তির আওতায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।
যদিও সিকে হাচিসন খাল পরিচালনা করে না, তবু খালের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখে চীন-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, পানামা খাল ও এর আশপাশের অবকাঠামোয় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চীন অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বেইজিংয়ের দাবি, খালকে কেন্দ্র করে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা এবং খালটির ওপর নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর অজুহাত।
ট্রাম্পের হুমকি, পানামার অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, চীন পানামায় অতিরিক্ত প্রভাব অর্জন করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
পানামা অবশ্য এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো খালের ওপর পানামার সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে খালটি স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষ থাকবে বলেও জোর দিয়েছেন তিনি।
খালের নিয়ন্ত্রণ একসময় যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছিল। ১৯৭৭ সালের তোরিহোস-কার্টার চুক্তির মাধ্যমে ধাপে ধাপে এর নিয়ন্ত্রণ পানামার কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পুরো নিয়ন্ত্রণ পানামার হাতে চলে যায়।
বর্তমানে পানামা ক্যানাল অথরিটি খালটি পরিচালনা করছে।
হরমুজের সঙ্গে পানামার সম্পর্ক কোথায়?
হরমুজ প্রণালি ও পানামা খালের গুরুত্ব এক নয়। হরমুজ মূলত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ, অন্যদিকে পানামা খাল বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।
তবে ইরান যুদ্ধ এই দুই নৌপথকে একটি অভিন্ন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প সরবরাহপথের ওপর চাপ বাড়ছে। এর ফলে পানামা খালের চাহিদা বাড়ছে। একই সময়ে খালটির কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নতুন করে সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি অঞ্চলের সংঘাত কীভাবে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের অন্য একটি কৌশলগত নৌপথে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিতে পারে, পানামা খাল তারই উদাহরণ।
হরমুজ, লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব কিংবা পানামা—বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ নৌপথগুলো এখন শুধু বাণিজ্যের পথ নয়; এগুলো ক্রমেই পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।
