মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের পর গাজায় দুজনকে হত্যা করে ইসরায়েলি সেনারা

মিডল ইস্ট আই
মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের পর গাজায় দুজনকে হত্যা করে ইসরায়েলি সেনারা
গাজায় মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের পর নাদি মারুফ ও আলী মারুফকে হত্যার আগে পাওয়া সর্বশেষ ছবি। ছবি: সংগৃহীত

গাজার উত্তরাঞ্চলে দুই বয়স্ক ফিলিস্তিনিকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের পর ইসরায়েলি বাহিনী হত্যা করেছে—এমন অভিযোগের নতুন প্রমাণ হিসেবে একটি ছবি প্রকাশ করেছেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিস তিরাওয়ি। ছবিটি ২০২৪ সালের নভেম্বরে ওই দুই ব্যক্তির মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে তোলা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

Advertisement

ছবিতে চোখ বাঁধা দুই বৃদ্ধের মাঝখানে ইসরায়েলি সেনাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সাংবাদিক তিরাওয়ি তাদের নাদি মারুফ ও আলী মারুফ হিসেবে শনাক্ত করেছেন।

তার দাবি, গাজার বেইত লাহিয়া থেকে তাদের ধরে নিয়ে কয়েক দিন মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের পর হত্যা করা হয়।

গত বছরের অক্টোবরে তিরাওয়ি জানিয়েছিলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কেফির ব্রিগেডের ৯২তম ব্যাটালিয়নের সদস্যরা ওই দুই বৃদ্ধকে আটক করেছিলেন। পরে তাদের বিভিন্ন স্থানে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম প্যালেস্টাইন ক্রনিকলও জানিয়েছিল, কয়েক দিন আটকে রাখার পর ওই দুই ব্যক্তিকে আল-তাওয়াম এলাকার কাছে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পরে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রকাশিত কিছু ছবিতে তাদের অন্তর্বাস পরা অবস্থায় এবং একজনের হাত পেছনে বাঁধা দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা ভবন বা স্থাপনায় প্রবেশের আগে তাদের সেখানে ঢুকতে বাধ্য করেছিল।

জেনেভাভিত্তিক ইউরো-মেডিটেরেনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরের চেয়ারম্যান রামি আবদুও সে সময় অভিযোগ করেছিলেন, কয়েক দিন মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের পর স্বজনেরা ওই দুই ব্যক্তির মরদেহ খুঁজে পান।

গাজায় সামরিক অভিযানের সময় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের জোর করে ভবন ও সুড়ঙ্গে প্রবেশ করানোর অভিযোগ এর আগেও উঠেছে। জাতিসংঘের এক তদন্তে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সেনাদের আগে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের বাড়িতে প্রবেশে বাধ্য করা মানবঢাল ব্যবহারের শামিল এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করে।

২০২৫ সালের মে মাসে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা তদন্তের কথা জানিয়েছিল। একই সঙ্গে তারা স্বীকার করে, বেসামরিক নাগরিকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা বা সামরিক অভিযানে অংশ নিতে বাধ্য করা তাদের নির্দেশনার অধীনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

এ ছাড়া ২০২৫ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক অনুসন্ধানেও ফিলিস্তিনিদের ভবন ও সুড়ঙ্গে ইসরায়েলি সেনাদের আগে প্রবেশে বাধ্য করার অভিযোগ উঠে আসে। কয়েকজন ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি সেনাসদস্য এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কথা জানিয়েছিলেন।

এদিকে ইসরায়েলি হেফাজতে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতন ও চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগও অব্যাহত রয়েছে। ৭১ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি চিকিৎসক মাজেন রানতিসি জানিয়েছেন, রামাল্লায় তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আটকের পর ওফের কারাগারে প্রথম ১০ দিন তার নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হয়নি। তার আইনজীবীর দাবি, কারাগারে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া এবং নিম্নমানের খাবার দেওয়ার কারণে তার দ্রুত ওজন কমে যায়।

গাজায় চলমান মানবিক সংকটের মধ্যেই এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা যুদ্ধে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মরদেহ চাপা পড়ে থাকায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে বিভিন্ন মানবিক সংস্থা জানিয়েছে।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলোও গাজায় খাদ্যসংকট ও অপুষ্টির ভয়াবহতা নিয়ে সতর্ক করে আসছে। বেসামরিক নাগরিক, বন্দী ও নিহত ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে নতুন নতুন অভিযোগ ইসরায়েলের গাজা অভিযানের বিষয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত ও সমালোচনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের পর গাজায় দুজনকে হত্যা করে ইসরায়েলি সেনারা