একটি শব্দ কীভাবে হয়ে উঠল আন্তর্জাতিক জোট, ব্রিকসের নেপথ্যের ইতিহাস

একটি শব্দের জন্ম হয়েছিল একটি গবেষণা প্রতিবেদনে। তখন সেটি ছিল চারটি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বোঝানোর একটি ধারণা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই শব্দই হয়ে উঠল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোর নাম।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে ২০০১ সালে যে ধারণার জন্ম, পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। নাম বদলে হয় ব্রিকস। এরপর একে একে আরও কয়েকটি দেশ যুক্ত হয়েছে। এখন এই জোটের আলোচনায় শুধু অর্থনীতি নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, স্বাস্থ্য এবং বিশ্ব শাসনব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জায়গা পেয়েছে।
ব্রিকসের ইতিহাস তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক জোটের ইতিহাস নয়। এটি একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনেরও গল্প।
একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে যাত্রা শুরু
ব্রিকসের গল্প শুরু করতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০০১ সালে। সে সময় মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও'নিল একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়।
এই চার দেশের নামের ইংরেজি আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি হয়েছিল ব্রিক শব্দটি। তখন এটি কোনো আন্তর্জাতিক জোটের নাম ছিল না। ছিল ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত বিকাশমান বড় অর্থনীতিগুলোর সম্ভাবনা বোঝানোর একটি অর্থনৈতিক ধারণা।
গবেষণাটিতে বলা হয়েছিল, ওই চার দেশ আগামী কয়েক দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের বিশাল জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ, উৎপাদন ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তাদের আলাদা গুরুত্ব দেয়।
তখন কেউ হয়তো ভাবেনি, অর্থনীতিবিদদের ব্যবহৃত সেই শব্দ একদিন রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং বৈশ্বিক কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে।
কিন্তু ঠিক সেটিই ঘটেছিল।
অর্থনৈতিক ধারণা থেকে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা
ব্রিক ধারণাটি দ্রুত অর্থনীতি ও বিনিয়োগের জগতে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে চার দেশও ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে, তাদের মধ্যে শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনার মিল নেই, আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক ক্ষেত্রেও অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।
২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হয়। এরপর নিয়মিত বৈঠক শুরু হয়। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন, জ্বালানি এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় আলোচনায় আসে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট চার দেশের সহযোগিতাকে নতুন গুরুত্ব দেয়।
সেই সংকট দেখিয়ে দিয়েছিল, বিশ্ব অর্থনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্রিক দেশগুলো মনে করেছিল, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
এই সময় থেকেই ব্রিক ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা কাঠামোর দিকে এগিয়ে যায়।
২০০৯ সালে প্রথম শীর্ষ সম্মেলন
ব্রিকসের ইতিহাসে ২০০৯ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
সে বছরের ১৬ জুন রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গ শহরে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম ব্রিক শীর্ষ সম্মেলন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের রাষ্ট্রপ্রধানরা এতে অংশ নেন। এই সম্মেলন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রথমবারের মতো চার দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে এক মঞ্চে বসে নিজেদের অভিন্ন স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করে।

আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা সংস্কার, বিশ্ব অর্থনীতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার মতো বিষয় সেখানে গুরুত্ব পায়। চার দেশ একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। তাদের বক্তব্য ছিল, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দেশগুলোর অংশগ্রহণ আরও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের পর ব্রিক আর শুধু অর্থনীতিবিদদের দেওয়া একটি নাম থাকল না। এটি হয়ে উঠল রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব সহযোগিতার একটি মঞ্চ।
দক্ষিণ আফ্রিকার যোগদান এবং ব্রিকসের জন্ম
ব্রিকের পরবর্তী বড় পরিবর্তন আসে দক্ষিণ আফ্রিকার যোগদানের মাধ্যমে। ২০১০ সালের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে এই জোটে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২০১১ সালের এপ্রিলে চীনের সানিয়া শহরে অনুষ্ঠিত তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকা আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নেয়।
এর ফলে ব্রিকের নাম বদলে হয় ব্রিকস। শেষের নতুন অক্ষরটি এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকার নামের প্রথম অক্ষর থেকে।
দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতি ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত বা চীনের তুলনায় ছোট হলেও দেশটির রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট। আফ্রিকা মহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার যোগদান ব্রিকসকে আরও বিস্তৃত প্রতিনিধিত্ব দেয়।
এর মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার পাশাপাশি আফ্রিকাও এই সহযোগিতা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
ব্রিকস শুধু অর্থনীতির জোট নয়
শুরুতে ব্রিকসের মূল আলোচনার কেন্দ্র ছিল অর্থনীতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এর কাজের ক্ষেত্র অনেক বেড়ে যায়।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কৃষি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, শিল্প ও সংস্কৃতি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়তে থাকে। শুধু রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈঠক নয়, বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যেও বৈঠক শুরু হয়।
ফলে ব্রিকস একটি বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে বহুস্তরীয় সহযোগিতা ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
২০১৪ সালে বড় প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ
ব্রিকসের ইতিহাসে ২০১৪ সাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের ফোর্তালেজা শহরে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনে পাঁচ সদস্য দেশ নতুন উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চুক্তি স্বাক্ষর করে। ব্যাংকটির মূল উদ্দেশ্য ছিল অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা। এর সদর দপ্তর স্থাপন করা হয় চীনের সাংহাই শহরে। একই সম্মেলনে আকস্মিক আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর জন্য পারস্পরিক সহায়তার একটি ব্যবস্থা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর নাম দেওয়া হয় আকস্মিক মুদ্রা সঞ্চয় ব্যবস্থা।
নতুন উন্নয়ন ব্যাংক ব্রিকসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনগুলোর একটি। কারণ এর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো শুধু আলোচনা নয়, উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রেও নিজেদের একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।
পরবর্তী সময়ে এই ব্যাংক ব্রিকসের বাইরের উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিভিন্ন প্রকল্পেও অর্থায়ন করেছে।
২০১৫ থেকে ২০২২: সহযোগিতার বিস্তার

২০১৫ সালে রাশিয়ার উফা শহরে অনুষ্ঠিত সম্মেলন থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে ব্রিকসের কর্মসূচি আরও বিস্তৃত হতে থাকে। ভারতের গোয়া, চীনের শিয়ামেন, দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ এবং ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়ার সম্মেলনগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, পরিবেশ এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতা বাড়ে।
২০২০ সালের করোনা মহামারি বিশ্বব্যবস্থার সামনে নতুন অনেক প্রশ্ন তুলে দেয়। স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, চিকিৎসা সহযোগিতা, টিকা, ওষুধ এবং মহামারির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা বাড়ে।
এভাবে জোটটির কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা ক্ষেত্রেও পৌঁছে যায়।
২০২৩ সালে বড় সম্প্রসারণ
ব্রিকসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি আসে ২০২৩ সালে। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত পঞ্চদশ শীর্ষ সম্মেলনে জোটের সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সৌদি আরব, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইথিওপিয়া এবং ইরানকে নতুন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাদের সদস্যপদ কার্যকর হয় ২০২৪ সালে।
এই সম্প্রসারণের ফলে ব্রিকসের ভৌগোলিক পরিসর অনেক বেড়ে যায়।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদক দেশ, আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র এবং এশিয়ার একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি একই কাঠামোর মধ্যে চলে আসে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ব্রিকসের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। তবে সদস্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়। কারণ প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক কাঠামো ও পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার যোগদান
ব্রিকসের সম্প্রসারণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আসে ২০২৫ সালে। সে বছরের ৬ জানুয়ারি ইন্দোনেশিয়াকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার যোগদান ব্রিকসের ভৌগোলিক গুরুত্ব আরও বাড়ায়। এর ফলে ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে এখন দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন অংশ, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশ রয়েছে।
এটি ব্রিকসকে আগের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোতে পরিণত করেছে।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের আলোচনা
ব্রিকসকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা। ব্রিকসের বিভিন্ন বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং আন্তঃদেশীয় লেনদেনের খরচ কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। ব্রিকসের নিজস্ব কোনো অভিন্ন মুদ্রা এখনো চালু হয়নি। সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক লেনদেন বাড়ানোর বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে।
অর্থাৎ ব্রিকস ইতিমধ্যে একটি নতুন অভিন্ন মুদ্রা চালু করেছে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
ব্রিকস কি পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধী?
ব্রিকস নিয়ে আরেকটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো, এটি কি পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে গঠিত কোনো জোট?
বাস্তবতা এতটা সরল নয়। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর প্রত্যেকের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। আবার কোনো কোনো সদস্যের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল।
ব্রিকসের প্রধান বক্তব্য হলো, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে বিশ্বের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরে ব্রিকসের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ব্রিকসকে শুধু পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত চরিত্র পুরোপুরি বোঝা যায় না।
ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি
ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব। সম্প্রসারিত সদস্যদের বিবেচনায় নিলে বিশ্বের অর্থনীতি ও বাণিজ্যে ব্রিকসের অংশ উল্লেখযোগ্য।
২০২৩ সালের হিসাবে সম্প্রসারিত ব্রিকস সদস্যরা সম্মিলিতভাবে বিশ্ব মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ২৬ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে ব্রিকসের সরকারি তথ্য উল্লেখ করে। এর সঙ্গে রয়েছে বিপুল জনসংখ্যা, বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্বালানি উৎপাদন, কৃষি, শিল্প এবং দ্রুত বাড়তে থাকা ভোক্তা বাজার। আর এই বৈচিত্র্যই ব্রিকসের অন্যতম শক্তি। তবে একই বৈচিত্র্য আবার বড় চ্যালেঞ্জও।
ব্রিকস যত বড় হয়েছে, এর ভেতরের পার্থক্যও তত স্পষ্ট হয়েছে।
ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ক অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। আবার ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে।
অন্যদিকে নতুন সদস্যদেরও নিজেদের আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। তাই এতগুলো দেশের মধ্যে সব বিষয়ে একই অবস্থান তৈরি করা সহজ নয়। ব্রিকসের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে জোটটি কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। শুধু বড় হওয়া নয়, অভিন্ন স্বার্থের জায়গায় বাস্তব সহযোগিতা তৈরি করাই ভবিষ্যতে এর সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি হবে।
২০২৬ সালে ব্রিকসের অবস্থান
২০২৬ সালে এসে ব্রিকস আর সেই ২০০১ সালের অর্থনৈতিক ধারণা নয়। একটি গবেষণা প্রতিবেদনে চারটি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। বর্তমানে ব্রিকসের আলোচনায় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার, উন্নয়ন অর্থায়ন, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো বিষয় রয়েছে।
২০২৬ সালে ভারতের সভাপতিত্বে নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সম্মেলনও দেখিয়েছে, সংগঠনটি এখন শুধু কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির বৈঠক নয়। এর পরিসর অনেক বিস্তৃত।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দেশ ব্রিকসের সঙ্গে সহযোগিতা করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে এর সদস্য সংখ্যা আরও বাড়বে কি না, সেটিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ভবিষ্যতে ব্রিকস
ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন। তবে এর গতিপথ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। ২০০১ সালে যে ধারণার জন্ম হয়েছিল চারটি দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিকে ঘিরে, সেটি এখন অনেক বড় একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামো।
নতুন উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্রিকস একটি স্থায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। সদস্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে এর ভৌগোলিক পরিসর বেড়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক মতপার্থক্য, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করা সহজ হবে না।
ব্রিকসের ভবিষ্যৎ সাফল্য তাই শুধু এর সদস্য সংখ্যা বা অর্থনৈতিক আকারের ওপর নির্ভর করবে না। বরং সদস্য দেশগুলো কতটা বাস্তব সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারে, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ব্রিকসের ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে। ২০০১ সালে এটি ছিল একটি গবেষণা প্রতিবেদনের ধারণা। ২০০৬ সালে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সহযোগিতা। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম শীর্ষ সম্মেলন। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর ব্রিক হয়ে ওঠে ব্রিকস। ২০১৪ সালে তৈরি হয় নতুন উন্নয়ন ব্যাংক। ২০২৪ সালে শুরু হয় বড় সদস্য সম্প্রসারণ। ২০২৫ সালে যোগ দেয় ইন্দোনেশিয়া।
এই দীর্ঘ যাত্রায় ব্রিকসের চরিত্রও বদলেছে।
একসময় যেখানে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এখন সেখানে রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য।
তাই ব্রিকসের গল্প এখনো শেষ হয়নি। বরং ২০০১ সালে যে গল্পের শুরু হয়েছিল একটি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিবেদনে, সেটি এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে। আগামী দিনে ব্রিকস কতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলো নিজেদের ভিন্ন স্বার্থের মধ্যে কতটা সমন্বয় করতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে পরিবর্তনের দাবি কতটা বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দিতে পারে তার ওপর।
সূত্র
গোল্ডম্যান স্যাকসের ব্রিক ধারণার ইতিহাস
ব্রিকসের সরকারি ওয়েবসাইট ও ইতিহাস
ব্রিকসের বিবর্তন ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদন