ভারতের একাধিক রাজ্যে বন্যা ও ভূমিধস, আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি

মৌসুমি বায়ুর শেষ চরণে টানা ভারী বৃষ্টিপাত এবং একাধিক নদীর জলস্তর বৃদ্ধির কারণে ভারতের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বন্যা ও ভূমিধস পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, বিহার, উত্তরবঙ্গ, সিকিম ও উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি ও সমতল এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত।
গত ৭২ ঘণ্টায় পূর্ব ও উত্তর ভারতের রাজ্যগুলো মিলিয়ে অন্তত ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়াও কাঁচা বাড়ি ধ্বসে ও পাহাড়ি ধ্বস ও বজ্রপাতের মত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৪৬ জনেরও বেশি গুরুতর আহত হয়েছেন। বিহার ও সিকিমের পাহাড়ি ধস ও পাহাড়ি ঢলের এলাকায় বেশ কয়েকজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। শুধু উত্তর প্রদেশেই ১,০০০-এর বেশি বাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৃতের সংখ্যার নিরিখেও শীর্ষে রয়েছে উত্তর প্রদেশ।
সিকিম
গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে গ্যাংশিং এবং রিম্বি এলাকায় ব্যাপক ভূমিধস ঘটেছে। রিম্বির কাছে ৩০টিরও বেশি ঘরবাড়ি ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিস্তা ও চ্যাকুং নদীতে ধসের কাদা-পাথর জমা হয়ে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় নিচু এলাকায় হড়পা বানের চরম সতর্কতা জারি রয়েছে। ১২০ জনেরও বেশি অধিবাসীকে নিরাপদ স্থানে ও ত্রাণ শিবিরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
উত্তরবঙ্গ (পশ্চিমবঙ্গ)
সিকিম ও ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তা, তোর্সা ও জলঢাকা নদীর জলস্তর বিপদসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে।দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট-বড় ধসের ফলে জাতীয় সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কালচিনি ও শিলিগুড়ির সংলগ্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় প্রশাসনিক সতর্কতা অব্যাহত।
বিহার
বিহারের বিপদ বাড়িয়েছে নেপালের অববাহিকা অঞ্চলের অবিরাম বৃষ্টিপাত। বাধ্য হয়ে বাল্মিকীনগর ব্যারেজ থেকে ক্রমাগত জল ছাড়া হচ্ছে। এর জেরে শনিবার পশ্চিম চম্পারণ জেলায় গণ্ডক নদীর জল লোকালয় ভাসিয়েছে। বাড়িঘরে ঢুকে পড়েছে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় ২ হাজারের বেশি গ্রামবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে। নেপালের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন নদীগুলিতে জলের স্তর বেড়ে যাওয়ায় শঙ্কিত বিহার প্রশাসন। এই অবস্থায় নদী তীরবর্তী এলাকার জেলা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্কতার নির্দেশ দিয়েছেন শনিবার রাজ্যে মুখ্যসচিব প্রত্যয় অমৃত।
উত্তরাখণ্ড ও উত্তর প্রদেশ
উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি জেলাগুলোতে লাগাতার ভূমিধসের ফলে একাধিক রাজ্য সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, সংলগ্ন উত্তর প্রদেশে গত তিন দিনে প্রবল বৃষ্টি ও বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি রেকর্ড করা হয়েছে।
বাড়ি ধস ও বজ্রপাতে শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশেই ৫৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।উত্তর প্রদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র সীতাপুর জেলায় মৃত্যু হয়েছে সাত জনের। এ ছাড়াও লখিমপুর খেরি, বাহরাইচ এবং বলরামপুর– প্রতিটি জেলায় পাঁচ জন মারা গিয়েছে। অযোধ্যা ও গোরক্ষপুরে চার জন করে প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রবল বৃষ্টি, ঝড় ও জল জমে যাওয়ার কারণে রাজ্য জুড়ে মোট ১,০২১টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে হারদোই, সীতাপুর, চন্দৌলি, অরাইয়া, গোন্ডা, হামিরপুর, শাহজাহানপুর এবং বাহরাইচেও বহু বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু বসতবাড়িই নয়, গবাদি পশুরও মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হিসাবে ১০৭টি প্রাণীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। হারদোইয়ে ২৮টি, সীতাপুরে ১৬টি এবং কনৌজে ১৪টি প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় উত্তরপ্রদেশে গড়ে ৬৬.৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। যেখানে এই সময়ে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয় ৭.৬ মিলিমিটার। অর্থাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত হয়েছে প্রায় ৭৭৫ শতাংশ বেশি।উত্তরপ্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে ৬৩টিতে স্বাভাবিকের থেকে বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
দেশটির আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, রবিবারও পূর্ব উত্তরপ্রদেশে ভারী বৃষ্টি এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বজ্রপাত ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।
উড়িষ্যা
ওড়িশায় গত ৪৮ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিপাতে ১০টি জেলার অন্তত ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়েছে জাতীয় ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যরা। রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী সুরেশ পূজারি জানিয়েছেন, বিশেষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ ওড়িশা। বিশেষ করে কোরাপুট, নবরঙ্গপুর, মালকানগিরি, রায়গড়া, গঞ্জাম ও গজপতি জেলা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত।
রাজ্য সরকার জানিয়েছে, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি আর্বান এলাকার ৪৯টি ওয়ার্ড এবং ৮০টি ব্লক। এছাড়াও ৩২৫টি গ্রাম পঞ্চায়েত ও ১,০৭১টি গ্রাম জল থইথই। ওড়িশার ত্রাণ কমিশনার রাজেশ প্রভাকর পাতিল জানান, একটানা বৃষ্টিতে ৭২১টি বাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪,৪৮০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ছত্তিশগড়
অতিরিক্ত বৃষ্টিতে নাকানিচোবানি খাচ্ছে ছত্তিশগড়ও। রাজ্যের প্রশাসনিক কর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বহু এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত। একটানা কারণে বৃষ্টির কারণে আট জেলায় বন্ধ স্কুল। শুক্রবার কোন্দাগাঁও এলাকায় জলে ভেসে যাওয়া ধানক্ষেতে মাছ ধরার সময় জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ৪০ বছরের এক কৃষকের। খারাপ আবহাওয়ার কারণে দান্তেওয়াড়া, বিজাপুর, কোন্ডাগাঁও, কাঙ্কের, বস্তার, গারিয়াঁবন্দ, ধামতারি ও দুর্গের সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সরকারি স্কুলগুলির পরীক্ষাও স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ
বন্যা বিধ্বস্ত এলাকায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দল বন্যা ও ধসপ্রবণ এলাকাগুলোতে উদ্ধারকার্য চালাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে শুকনো খাবার, পানীয় জল ও অস্থায়ী তাঁবু সরবরাহ করা হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তর থেকে আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাহাড়ি এলাকায় আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় উদ্ধারকাজে লাল সতর্কতা বহাল রাখা হয়েছে।