logo
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা: ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের ঐতিহাসিক ভরাডুবির নেপথ্যে

ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা: ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের ঐতিহাসিক ভরাডুবির নেপথ্যে
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে, ১৪ অক্টোবর মন্টানার কালিস্পেলের ম্যাজেস্টিক ভ্যালি অ্যারেনায় আয়োজিত একটি নির্বাচনী প্রচারণামূলক সমাবেশে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লাল গালিচা বেয়ে মঞ্চের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

নির্বাচনের মাত্র ছয় দিন আগে ট্রাম্পের দুই ডজনের বেশি শীর্ষ রাজনৈতিক কৌশলবিদ একটি গোপন ভিডিও বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকের পরিবেশ ছিল হতাশাপূর্ণ। ট্রাম্পের প্রধান জনমত জরিপকারী টনি ফাব্রিজিও আলোচনার শুরুতেই পরিস্থিতিকে দুটি সম্ভাব্য ফলাফলে ভাগ করেন। প্রথমটি ছিল আশাবাদী। সেখানে ধারণা করা হয়েছিল, ট্রাম্পের ৪০০ মিলিয়ন ডলারের সুপার পিএসি কাঙ্ক্ষিত ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারবে।

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি ছিল ভয়াবহ পরাজয়ের। হোয়াইট হাউসের সাবেক উপপ্রধান কর্মকর্তা জেমস ব্লেয়ার রসিকতা করে বলেন, তিনি নিজের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন। অন্যদেরও একই প্রস্তুতি নেয়া উচিত। প্রায় আধঘণ্টার ওই আলোচনায় কারাগারে যাওয়া, ক্ষমা পাওয়া কিংবা দেশ ছেড়ে পালানোর মতো বিষয় নিয়েও বিদ্রূপ করা হয়। এসব কথোপকথনের বিবরণ দিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি।

নির্বাচনের ফলাফল শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করে। ডেমোক্রেটরা দুই কক্ষেই জয়ী হন।

এই বিপর্যয়ের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান। নির্বাচনের আগে তিনি নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ তার দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। একইভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েও তিনি তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। বরং যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যায়।

রিপাবলিকানদের পরাজয় তাই শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফল ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত স্বার্থকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ওপর প্রাধান্য দেয়ার অভিযোগ।

২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ঘটনার পর রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়া ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে তার কিছু সহযোগী মনে করেছিলেন, তিনি নিজেকে রাজনৈতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেছেন। তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্পদ বৃদ্ধিতে প্রেসিডেন্সি ব্যবহারের অভিযোগও ক্রমাগত সামনে আসতে থাকে।

২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে দুর্নীতি ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়। ফক্স নিউজের একটি জনমত জরিপেও বিষয়টি উঠে আসে। যদিও হোয়াইট হাউস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, প্রেসিডেন্ট কেবল মার্কিন জনগণের স্বার্থেই কাজ করছেন।

এর আগে ২০২৫ সালে ট্রাম্পের শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবও কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায়। কানসাস, টেক্সাস ও আইওয়ার মতো রাজ্যের কৃষকরা অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েন।

অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষ যখন দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন ট্রাম্পের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে নতুন বলরুম, গলফ কোর্স এবং হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার প্রসঙ্গ। নির্বাচনের আগের দিনও তিনি ন্যাশনাল মলের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার নিয়ে কথা বলেন এবং রসিকতা করে নিজের নামে সেটির নামকরণের সম্ভাবনার কথা জানান।

ডেমোক্রেটরা এই পরিস্থিতিকে নির্বাচনী প্রচারের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা ট্রাম্প প্রশাসনের দুর্নীতি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ক্ষমতাবানদের সুবিধা পাওয়ার বিষয়গুলোকে একই রাজনৈতিক বয়ানে নিয়ে আসেন। তাদের বক্তব্য ছিল, সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে থাকলেও প্রেসিডেন্ট ও তার ঘনিষ্ঠ মহল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত।

নির্বাচনী কৌশলে ডেমোক্রেটদের অগ্রগতি

রিপাবলিকানরা নির্বাচনকে সাধারণ জ্ঞান ও উগ্র বামপন্থার মধ্যকার লড়াই হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তারা ডেমোক্রেটদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ধারাকে আক্রমণ করেন।

কিন্তু ট্রাম্পের নিজের জনমত জরিপকারীর চূড়ান্ত জরিপে দেখা যায়, ম্যাগা রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র; দুটিই ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় ছিল না। তবে ম্যাগা পরিচয়ের সঙ্গে আরও বেশি নেতিবাচক ধারণা যুক্ত হয়েছিল।

যেসব রিপাবলিকান ভোটার ভোট দিতে আগ্রহী ছিলেন না, তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল কী করলে তারা ভোটকেন্দ্রে ফিরবেন। তাদের প্রধান দুটি উত্তর ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা।

অন্যদিকে ডেমোক্রেটরা প্রচারণার শুরু থেকেই নির্বাচনী এলাকার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করেন। তারা রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম এমন প্রার্থী খুঁজতে থাকেন। সিনেটের জন্য সাবেক গভর্নর রয় কুপার ও সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউনের মতো পরিচিত নেতাদের নির্বাচনে রাজি করানো হয়।

প্রতিনিধি পরিষদেও তারা এমন প্রার্থীদের মনোনয়ন দেন, যাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে পেশাগত ও সামাজিক পরিচিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য, চিকিৎসক, কৃষক, দাবানল মোকাবিলায় কাজ করা কর্মী এবং সংগীতশিল্পীদের মতো ব্যক্তিদের প্রার্থী করা হয়।

ডেমোক্রেটদের ধারণা ছিল, রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটির ভোটারদের কাছে পেশাদার রাজনীতিবিদদের তুলনায় এসব প্রার্থী বেশি গ্রহণযোগ্য হবেন।

প্রার্থী বাছাইয়ে ট্রাম্পের ভুল

ডেমোক্রেট নেতা চাক শুমার যখন দক্ষতার সঙ্গে সিনেটের জন্য শক্তিশালী প্রার্থী নির্বাচন করছিলেন, তখন ট্রাম্পের একের পর এক সিদ্ধান্ত রিপাবলিকানদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করে।

আইওয়ার সিনেটর জোনি আর্নস্ট এবং উত্তর ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিস ট্রাম্পের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে হুমকি দেন। শেষ পর্যন্ত দুজনই অবসরের সিদ্ধান্ত নেন। এতে রিপাবলিকানদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

উত্তর ক্যারোলাইনায় ট্রাম্প মাইকেল হোয়াটলিকে সমর্থন দেন। তিনি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান হলেও নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত সাবেক ডেমোক্রেট গভর্নর রয় কুপারের কাছে পরাজিত হন।

দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তার বোন ডারলিন গ্রাহামকে পূর্ণ মেয়াদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ানোর সমর্থন দেন ট্রাম্প। কিন্তু তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ডেমোক্রেট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজের কাছে হেরে যান।

তবে রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি করেন টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন। নানা বিতর্ক ও কেলেঙ্কারির কারণে তার নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প বর্তমান সিনেটর জন কর্নিনের পরিবর্তে প্যাক্সটনকে সমর্থন করেন।

প্যাক্সটনের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও রিপাবলিকানরা প্রত্যাশিত ফল পাননি। ফলে অন্য রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের সহায়তায় এই অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ নষ্ট হয়। টেক্সাসের নির্বাচনে প্যাক্সটনের পরাজয় রিপাবলিকানদের কৌশলগত ভুলকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

ট্রাম্পের সহযোগীদের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। এক বৈঠকে জেমস ব্লেয়ার মন্তব্য করেছিলেন, দলের সবচেয়ে বড় শত্রু আসলে দল নিজেরাই।

ডেমোক্রেটদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি

২০২৫ সালের মে মাসে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে নিউইয়র্কের হাডসন ভ্যালিতে দাতা ও দলীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন চাক শুমার।

ডেমোক্রেটদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের সব আসন ধরে রাখার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের কাছ থেকে অন্তত চারটি আসন ছিনিয়ে নেয়া। এ লক্ষ্য অর্জনে শুমার কয়েক মাস ধরে রয় কুপারকে নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। একইভাবে ওহাইওর সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউনকেও পুনরায় নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন।

শুমার ব্রাউনকে বোঝান, তিনি নির্বাচনে অংশ না নিলে এবং ডেমোক্রেটরা অল্প ব্যবধানে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে ভবিষ্যতে সেই সিদ্ধান্তের জন্য অনুশোচনা করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত দুজনই নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয়ী হন।

প্রতিনিধি পরিষদের ক্ষেত্রেও ডেমোক্রেটরা নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প যেসব এলাকায় ১০ শতাংশ বা তার বেশি ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, সেসব এলাকাকে লক্ষ্য করে তারা প্রার্থী খুঁজতে শুরু করেন।

দলের পর্যালোচনায় দেখা যায়, সফল প্রার্থীদের মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল; মধ্যপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য।

তাই তারা এমন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেন, যাদের সাধারণ ভোটাররা সহজে গ্রহণ করতে পারেন এবং যারা পেশাদার রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত নন।

নির্বাচনী এলাকার সীমানা নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত

রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নতুন করে নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়।

২০২৫ সালের বসন্তে তৎকালীন উপপ্রধান স্টাফ জেমস ব্লেয়ার ট্রাম্পের কাছে একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এর লক্ষ্য ছিল দশক শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পরিবর্তন করে রিপাবলিকানদের জন্য বাড়তি আসন নিশ্চিত করা।

টেক্সাসে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ অন্য রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। হাকিম জেফ্রিস এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন এবং টেক্সাসে গিয়ে রাজ্য আইনপ্রণেতাদের এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানান। ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতারা প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানরা টেক্সাসে নিজেদের জন্য পাঁচটি বাড়তি সুবিধাজনক আসন তৈরি করতে সক্ষম হন।

এর জবাবে ক্যালিফোর্নিয়ায় গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের উদ্যোগে ডেমোক্রেটদের অনুকূলে পাঁচটি আসন তৈরির পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। ভার্জিনিয়াতেও একই ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে সেখানে আদালতের হস্তক্ষেপে সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়।

শুরুতে ব্লেয়ার মনে করেছিলেন, এই কৌশল রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সুবিধা নিশ্চিত করবে। কিন্তু নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। ডেমোক্রেটদের নির্বাচনী সাফল্য এবং বিভিন্ন রাজ্যে পাল্টা সীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ রিপাবলিকানদের পরিকল্পনাকে দুর্বল করে দেয়।

নির্বাচনের সময় দেখা যায়, নতুন করে সাজানো বহু নির্বাচনী এলাকাতেও ডেমোক্রেটরা জয়ী হচ্ছেন।

অভিবাসননীতি ও ইরান যুদ্ধ: নিজেদের তৈরি সংকট

২০২৬ সালের শুরুতে মিনিয়াপোলিসে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অভিযান সহিংস রূপ নেয়। ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে দুই বিক্ষোভকারী নিহত হন। উভয় ঘটনার ভিডিও প্রকাশিত হলে প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ে।

হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে কঠোর অভিবাসননীতি থেকে কিছুটা সরে আসার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। কিন্তু স্টিফেন মিলারসহ প্রশাসনের কট্টরপন্থী কর্মকর্তারা কঠোর অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন।

এই ঘটনার পর ডেমোক্রেটদের অভ্যন্তরীণ জরিপে অভিবাসন ইস্যুতে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হতে দেখা যায়। যে ইস্যু দীর্ঘদিন রিপাবলিকানদের নির্বাচনী শক্তি ছিল, সেটিই তাদের দুর্বলতায় পরিণত হয়।

এরপর ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন। শুরুতে তার উপদেষ্টারা ধারণা করেছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হবে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল, পেট্রোল ও সারের দাম এবং মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ মার্চ থেকেই জরিপে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অনেকেই বুঝতে পারছিলেন না, কেন প্রেসিডেন্ট নতুন একটি যুদ্ধে জড়ালেন। তাদের কাছে এটি ছিল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আরেকটি উদাহরণ।

যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নেয়া সাবেক মিত্র টাকার কার্লসন ও মার্জোরি টেইলর গ্রিনও প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা শুরু করেন।

জুনে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের উদ্যোগে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হলে রিপাবলিকান শিবিরে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। একটি জরিপে প্রস্তাবিত সমঝোতার প্রতি ভোটারদের ইতিবাচক মনোভাবও দেখা যায়। কিন্তু রিপাবলিকানদের ইরানবিষয়ক কট্টরপন্থীদের চাপের কারণে সমঝোতার উদ্যোগ জটিল হয়ে পড়ে।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের খবর প্রকাশিত হলেও যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব দূর হয়নি। নির্বাচনের পর এপির বিশ্লেষণেও ইরান যুদ্ধকে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নির্বাচনী তহবিল: অর্থ ছিল, কিন্তু পরিকল্পনা ছিল না

২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ের পরও ট্রাম্প রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রহ অব্যাহত রাখেন। তার সহযোগীদের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি নির্বাচনী তহবিল গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে এবং কোথায় ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা ছিল।

নির্বাচনের ১০০ দিনেরও কম সময় বাকি থাকলেও রিপাবলিকান কৌশলবিদরা জানতেন না, কোন কোন রাজ্যে অর্থ বিনিয়োগ করা হবে। ট্রাম্প নিজেও কখনো নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহ দেখাতেন, আবার কখনো মনে হতো বিষয়টি নিয়ে তার তেমন মাথাব্যথা নেই।

শেষ পর্যন্ত তার অনুমোদন পেতে দেরি হওয়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। বিজ্ঞাপনের সময় আগে থেকে বুক না করায় শেষ মুহূর্তে বিজ্ঞাপন প্রচারের খরচ অনেক বেড়ে যায়।

একই সময় ডেমোক্রেটরা পরিকল্পিতভাবে বিজ্ঞাপনের সময় কিনে রাখায় তুলনামূলক কম অর্থ ব্যয় করেও বেশি প্রচারণা চালাতে সক্ষম হন।

সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নিজেদের দূরে রাখেন তার দলের প্রার্থীরা। কিন্তু ট্রাম্পের সহযোগীরা উল্টো কৌশল গ্রহণ করেন। তারা প্রেসিডেন্টকে কেন্দ্র করে একটি বড় নির্বাচনী প্রচারণা গড়ে তোলেন।

সেপ্টেম্বরে ডালাসে দুই দিনব্যাপী একটি রাজনৈতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, রিপাবলিকানরা নির্বাচনে জয়ী হলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিককে ৫ হাজার ডলার দেয়া হবে।

ঘোষণাটি দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। এমনকি প্রস্তাবটি নিয়ে আগাম কোনো জনমত জরিপও করা হয়নি। পরে একই ধরনের প্রস্তাব যাচাই করে দেখা যায়, এটি ভোটারদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে খুব একটা কার্যকর নয়।

তবে সম্মেলনের একটি বড় সাফল্য ছিল অর্থ সংগ্রহ। প্রথম দিনেই ইলন মাস্ক রিপাবলিকানদের সিনেট-সংশ্লিষ্ট সুপার পিএসিকে ৭৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সহায়তায় মাস্কের মোট ব্যয় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় করা হয় টেক্সাসে কেন প্যাক্সটনের নির্বাচনী প্রচারণায়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেট প্রার্থী জেমস তালারিকোর বিরুদ্ধে ট্রান্সজেন্ডার অধিকার ইস্যুকে সামনে রেখে ব্যাপক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়।

কিন্তু নির্বাচনের মূল ইস্যু যখন অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়, তখন এ ধরনের বিজ্ঞাপনে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যেই মতবিরোধ দেখা দেয়।

ট্রাম্পের দল অর্থনৈতিক বার্তাকে গুরুত্ব দেয়ার পক্ষে থাকলেও সিনেটের রিপাবলিকান কৌশলবিদরা মনে করছিলেন, কিছু রাজ্যে অর্থনীতির প্রচলিত বার্তা ভোটারদের কাছে যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না।

দলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ট্রাম্প এবং সিনেটের রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যে আগে থেকেই দূরত্ব ছিল। ফলে নির্বাচনী প্রচারণায় ঐক্যবদ্ধ কৌশল গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

রিপাবলিকানদের পতনের পূর্বাভাস

২০২৬ সালের আগস্টের শেষ দিকে ডেমোক্রেটদের কংগ্রেসনাল নির্বাচনী কমিটির শীর্ষ কৌশলবিদ জুলি মার্জ তার দলের নেতাদের সামনে একটি সম্ভাব্য নির্বাচনী চিত্র তুলে ধরেন। সেখানে বড় ধরনের ডেমোক্রেট বিজয়ের সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

তিনি দলীয় কর্মকর্তাদের বোঝান, সম্ভাব্য বড় বিজয়ের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে যত বেশি সম্ভব নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।

এ জন্য তারা একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন। যেসব ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতার আসন তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে ছিল, তাদের সবার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে কিছু অর্থ রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে নতুন প্রার্থীদের সহায়তায় সরিয়ে নেয়া হয়।

এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার নতুন নির্বাচনী এলাকায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়।

অন্যদিকে রিপাবলিকানদের পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব তাদের নির্বাচনী অবস্থান দুর্বল করে দেয়।

অক্টোবরের শুরুতে তারা এমনকি দক্ষিণ ডাকোটা ও আইডাহোর মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী রাজ্যেও জনমত জরিপ শুরু করেন।

সিনেটের রিপাবলিকান নির্বাচনী তহবিল একপর্যায়ে উত্তর ক্যারোলাইনা থেকে বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে কানসাস, দক্ষিণ ক্যারোলাইনা এবং পরে মিসিসিপির মতো রাজ্যে অর্থ সরিয়ে নেয়। অথচ মিসিসিপিতে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।

রিপাবলিকান কৌশলবিদদের মধ্যে রাজ্যটি নিয়ে এমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল যে তারা বিদ্রূপ করে একে ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড মিসিসিপি’ বলে ডাকতেন।

প্রতিনিধি পরিষদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ছিল একই রকম। দক্ষিণ টেক্সাসের একটি আসনে রিপাবলিকানরা বিজ্ঞাপন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেও স্পিকার মাইক জনসনের উপস্থিতির কারণে তা এক দিন পিছিয়ে দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত ওই আসনে ডেমোক্রেট প্রার্থী বড় ব্যবধানে জয়ী হন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে ডেমোক্রেটদের পক্ষে জনমতের পরিবর্তন এতটাই ব্যাপক হয়ে ওঠে যে, প্রতিনিধি পরিষদের শতাধিক আসনে পরিচালিত জরিপও রিপাবলিকানদের প্রকৃত দুর্বলতা পুরোপুরি ধরতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ডেমোক্রেটদের বড় বিজয় শুধু রিপাবলিকানদের নয়, তাদের নিজেদের অনেক নেতাকেও বিস্মিত করে।