
গাজায় ইসরায়েলি হামলার ধ্বংসযজ্ঞে শুধু মানুষের জীবনই হারিয়ে যাচ্ছে না, সংকট তৈরি হয়েছে মরদেহ দাফন নিয়েও। একের পর এক কবরস্থান পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় প্রিয়জনকে দাফনের জন্য জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে পরিবারগুলোর। কোথাও ধ্বংসস্তূপের পাশে, কোথাও হাসপাতাল বা বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রে অস্থায়ীভাবে দাফন করা মরদেহগুলো পরে সরিয়ে নিতে হচ্ছে।
জায়গার সংকট, কবরস্থানের ধ্বংস এবং দাফনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গাজায় মৃতদেহের জন্যও যেন নিরাপদ এক টুকরো মাটি পাওয়া দুর্লভ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর বোমাবর্ষণের কারণে ৪০টিরও বেশি কবরস্থান ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে দাফনের জায়গা সংকটে স্কুল বা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে গণকবর দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর শুধুমাত্র হাসপাতাল প্রাঙ্গণে থাকা সাতটি গণকবর থেকেই ৫২৯ জন ফিলিস্তিনির দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, ২০ বছর বয়সি ওমর আল-সাওয়িকে তার ৪০ বছর বয়সী বাবা মোহাম্মদের দাফনের জন্য এক টুকরো জায়গা খুঁজে বের করতে হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলি-নির্ধারিত সামরিক অঞ্চল ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে গুলিতে নিহত হন তার বাবা। গাজা শহরের জেইতুন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ রাস্তার পাশে একটি ছোট দোকানে চা ও কফি বিক্রি করছিলেন। গত ১০ জুন একটি গুলি তার ঘাড়ে লাগলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
ওমর বাবাকে দাফন করতে জেইতুন কবরস্থানে গিয়ে দেখেন, কবরগুলো খুবই ঘন। নিহতদের অনেকেই গাজায় ইসরায়েলের চলমান হামলার শিকার। জায়গার তীব্র সংকট ও যুদ্ধকালীন কঠিন পরিস্থিতির কারণে বহু কবরে কেবল একটি পাথর এবং মৃতের নাম লেখা এক টুকরা কাগজ লাগিয়ে চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়েছে।
ওমর জানান, তার বাবার কবরটি ছিল কেবল একটি পাথর দিয়ে চিহ্নিত করা। কবরের ওপর তার বাবার নাম লেখা একটি কাগজ রাখা ছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কবরটি ভালো প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। সেখানে বর্তমানে একটি কবরের দাম প্রায় ৫০০ শেকেল (১৬৭ ডলার)। ওমরের পরিবারের পক্ষে এই খরচ বহন করা সম্ভব নয়। তাই তাদের বিকল্প পথ খুঁজতে হয়। ওমর বলেন, ‘নতুন কবর দেওয়ারও জাগয়া ছিল না। তাই আমাদের বাবাকে আমার দাদার কবরেই দাফন করতে হয়েছিল।’
আলজাজিরা বলছে, গাজায় পরিষেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়া এবং হামলার বিপদের কারণে যুদ্ধ চলাকালে হাজার হাজার নিহত ফিলিস্তিনিকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তাদের অনেককে বাগানে, তাঁবুতে, বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে, স্কুল কিংবা হাসপাতালের প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর হামলা কিছুটা কমে এলে পরিবারগুলো ধ্বংসস্তূপ ও অবস্থায়ী কবর থেকে স্বজনদের দেহাবশেষ উদ্ধা করতে শুরু করেন।
গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধু হাসপাতাল প্রাঙ্গণে থাকা সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ জন ফিলিস্তিনির দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে আরও অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের প্রত্যেককে দাফন কারা জন্য জায়গার প্রয়োজন। এই সুযোগের ওমরের পরিবারও মোহাম্মদের দেহাবশেষ খুঁড়ে বের করে চূড়ান্ত দাফনের জন্য কবরস্থানে নিয়ে যায়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার কারণে শুধু কবরের সংকট তৈরি হয়নি, বরং কবরস্থান ধ্বংস করার কারণেও এমনটা ঘটেছে। গাজার ওয়াকফ ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৪০টিরও বেশি কবরস্থান ধ্বংস করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইসরায়েলি বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার কবরস্থানগুলোতে প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় দাফনের উপযোগী জায়গার সংখ্যা আরও কমে গেছে। বোমাবর্ষণ ও জোরপূর্বক উচ্ছেদের কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ায় পূর্বে নির্ধারিত কবরস্থানগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হয়েছে।
গাজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সমাধিফলক তৈরির উপকরণের তীব্র ঘাটতির কারণে এখন দাফনের খরচ বেড়ে ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেল অর্থাৎ ২৩৫ থেকে ৩৩৫ ডলার পর্যন্ত ঠেকেছে। উপযুক্ত সমাধিফলক কেনার সামর্থ্য না হওয়া পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের গাঁথনি, কাদা বা ঢেউখেলানো টিনের পাত দিয়ে অস্থায়ী সমাধিচিহ্ন তৈরি করা হচ্ছে।
ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদাল্লাল জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলোই পূর্ণ ছিল। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘জায়গার অভাবে আমাদের নতুন কবরস্থান তৈরি করতে হবে।’ মন্ত্রণালয় নতুন জায়গা খুঁজছে, তবে অস্থায়ী স্থান থেকে স্থায়ী কবরস্থানে মরদেহ স্থানান্তর করা এখন কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মাদাল্লাল বলেন, ‘মরদেহ স্থানান্তর যথেচ্ছভাবে করা যাবে না। এ ব্যাপারে ওয়াকফ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।’
খান ইউনিস কবরস্থানে গত ১৯ বছর ধরে কাজ করা ৫০ বছর বয়সি গোরখোদক তাফেশ আবু হাতাব জানান, এই যুদ্ধ তার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। যুদ্ধের শুরুতে সেখানে প্রায় ৬০টি কবর ছিল, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজারে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তাফেশকে দিনে প্রায় ৩৫টি করে কবর খুঁড়তে হতো। তিনি বলেন, ‘আমরা এর আগে কখনো এতটা ভয়াবহ রক্তপাত দেখিনি। এমন কোনো দিন যায় না যেদিন কয়েক ডজন শহীদকে দাফন করা হয় না।’
দাফনকৃত মরদেহগুলোর অধিকাংশই নারী ও শিশু বলে জানান তাফেশ। অনেক সময় বোমাবর্ষণে গোটা ভবন বা তাঁবু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পর পুরো পরিবারের মরদেহ একসঙ্গে কবরস্থানে এসে পৌঁছায়। তাফেশ আকুল কণ্ঠে বলেন, ‘তারা আমাদের মাথার ওপর আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেয়, আর সেই ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপ দিয়েই আমরা নিজেদের কবর খুঁজি।’


