বাংলাদেশি পাটপণ্যে নতুন শুল্ক ভারতের, টনে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার

বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটপণ্যে সর্বোচ্চ প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। পাটের সুতা ও দড়ি, পাটের বস্তা এবং হেসিয়ান কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্যে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানভেদে নতুন হারে এই শুল্ক কার্যকর করা হয়েছে।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২৪ সেপ্টেম্বরের এক প্রজ্ঞাপনে সংশোধিত শুল্ক কাঠামোর বিষয়টি জানানো হয়। তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পাটপণ্যে শুল্ক শূন্য রাখা হয়েছে।
ভারতের বাণিজ্য প্রতিকারবিষয়ক মহাপরিচালকের (ডিজিটিআর) মধ্যবর্তী পর্যালোচনার পর নতুন এই শুল্ক কাঠামো করা হয়েছে। প্রায় তিন মাস আগে দেওয়া পর্যালোচনা প্রতিবেদনে ডিজিটিআর বলেছিল, বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা ভারতে পাটপণ্য ডাম্পিং অব্যাহত রেখেছে। এতে দেশটির স্থানীয় পাটশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০২৫ সালের জুনে ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন এবং এপি মেস্তা টুইন মিলস অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনের পর এই পর্যালোচনা শুরু করে ডিজিটিআর। বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর বিদ্যমান অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরও বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কি না, তা যাচাই করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
পর্যালোচনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ৫৪টি এবং নেপালে ৩৬টি পাটকলের কাছে তথ্য চাওয়া হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের ৩৮টি এবং নেপালের ৫টি পাটকল তথ্য দিয়ে সাড়া দেয়।
এর আগে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটের সুতা ও দড়ি, হেসিয়ান কাপড় এবং পাটের বস্তার ওপর প্রতি টনে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছিল ভারত। পরে বাংলাদেশের পাটের বস্তার কাপড়ও এই শুল্কের আওতায় আনা হয়। এর পর ভারতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশি ৩৬টি পাটপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিয়েছে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের পাটের সুতা ও দড়ি, পাটের বস্তা এবং হেসিয়ান কাপড়ের ওপর প্রতি টনে ৫৯ ডলার থেকে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পাটের সুতা ও দড়ি রপ্তানিকারক আশা জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ওপর সর্বনিম্ন ৫৯ ডলার শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ১৭টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি করা পাটের বস্তার ওপর প্রতি টনে ১২০ ডলার করে শুল্ক বসানো হয়েছে।
তবে, এএম জুট ইন্ডাস্ট্রিজ, বনানজা জুট কম্পোজিট, লাভলি জুট মিলস, নওহাটা জুট মিলস, পোদ্দার অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ও রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ তাদের রপ্তানি করা সব ধরনের পাটপণ্যের ক্ষেত্রে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক থেকে অব্যাহতি পেয়েছে।
এ ছাড়া নাটোর জুট মিলস ও জনতা জুট মিলসের পাটের বস্তা ও হেসিয়ান কাপড়ের ক্ষেত্রে শুল্কের হার শূন্য করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কোনো বাংলাদেশি উৎপাদনকারী পাটের সুতা বা দড়ি রপ্তানি করলে প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক দিতে হবে।
ডিজিটিআরের মধ্যবর্তী পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকালীন সময়ে ভারতে পাটপণ্যের চাহিদা ২০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি কমেছে ১৩ শতাংশ। এর মাধ্যমে বিদেশি উৎপাদনকারীরা ভারতীয় পাটকলের তুলনায় বাজারে অংশীদারত্ব বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাটপণ্যের রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমে ১ লাখ ১৭ হাজার টনে নেমেছে।
নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়ে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান তাপস প্রামাণিক এটিকে ‘একপেশে’ ও ‘জবরদস্তিমূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি পাটপণ্য রপ্তানির ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ভারত যে ভর্তুকির হার বিবেচনায় নিয়েছে, তা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে পাটশিল্পে অনেক বেশি ভর্তুকি দেওয়া হয় বলে যে ধারণা করা হচ্ছে, বাস্তবে তা নয়।
তাপস প্রামাণিক জানান, বর্তমানে সরকার পাটের সুতা ও দড়ি এবং পাটের বস্তা রপ্তানিতে ৩ থেকে ৫ শতাংশ ভর্তুকি দেয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি করে ১১৬ কোটি ডলার আয় করেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৮২ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।