পাকিস্তানে ‘স্বৈরাচারী’ শাসনের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপ চান ইমরান খানের ছেলে

পাকিস্তানে বিরোধী দলের নির্ধারিত কর্মসূচি ঘিরে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ‘নজিরবিহীন দমনপীড়নের’ তীব্র সমালোচনা করেছেন তার বড় ছেলে সুলেমান খান। একইসঙ্গে দেশটির ক্ষমতাসীন জোটকে ‘স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের হস্তক্ষেপ চেয়ে জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-কে ২৯ বছর বয়সী সুলেমান বলেন, ‘মধ্যরাতে কোনো কারণ ছাড়াই পরিবারের নারী সদস্যদের তুলে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক। এটা পাকিস্তানে একটি ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা চলার সুস্পষ্ট প্রমাণ।’
আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানী ইসলামাবাদে পূর্ব নির্ধারিত লং মার্চ ঠেকানোর অজুহাতে সম্প্রতি লাহোরে ইমরান খানের তিন বোন আলিমা খান, উজমা খান ও নোরিন নিয়াজিসহ বেশ কয়েকজন আত্মীয় এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) শত শত নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই বিক্ষোভ কয়েক দিনের কর্মসূচিতে পরিণত হতে পারে ধরে নিয়ে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজধানীর রাস্তায় শিপিং কনটেইনার বসিয়ে মিছিল ঠেকানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোকে ‘বিপুলসংখ্যক হতাহতের ঘটনা’ মোকাবিলার জন্যও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
ইমরানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথের বড় ছেলে সুলেমান দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-কে জানান, কারাগারে তার বাবার সঙ্গে ‘নির্মম ও বেআইনি’ আচরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি করে যেতে পারি ... এবং রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলতে পারি। শুধু আমাদের বাবার সঙ্গে যে নির্মম ও বেআইনি আচরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে নয়, বরং তার পরিবার, দল এবং যে কোনো ভিন্নমতাবলম্বী সাধারণ মানুষের সঙ্গেও কী ঘটছে, তা নিয়েও।’
ইমরান খানের ছোট ছেলে কাশিম খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আপনারা পরিবারগুলোকে গ্রেপ্তার করতে পারেন এবং মানুষকে সহিংসতার হুমকি দিতে পারেন। কিন্তু আপনারা ২৫ কোটি পাকিস্তানিকে কারারুদ্ধ করতে বা একটি প্রজন্মের ইচ্ছাশক্তিকে চূর্ণ করতে পারবেন না। কোনো শাসনব্যবস্থাই তার জনগণের চেয়ে বেশি শক্তিশালী নয়। সহিংসতার হুমকির মুখেও পাকিস্তানের জনগণ যেভাবে ন্যায়বিচারের দাবিতে একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে, তা বিশ্বকে অবশ্যই দেখতে হবে।’
চলতি মাসের শুরুতে ইমরানের দুই ছেলে সুলেইমান ও কাসিম ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান-কে জানান, কারাগারে তাদের বাবাকে ‘ধীরে ধীরে হত্যা করা হচ্ছে’ বলে আশঙ্কা করছেন। তারা ইমরান খানের কারাবাসকে ‘এক ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
গত বছর সেপ্টেম্বরে ইন্ডিপেনডেন্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমরানের ছোট ছেলে কাসিম বলেছিলেন, ‘আমার বাবাকে যে অবস্থায় রাখা হয়েছে, তা অত্যন্ত শোচনীয়। তাকে কার্যত একটি মৃত্যুপুরীতে আটকে রাখা হয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্যবিধি খুবই খারাপ এবং কোনো উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা নেই।’
পিটিআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার আলী বুখারি বলেছেন, দেশব্যাপী এই প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়ে দলটি ‘শতভাগ এগিয়ে যাচ্ছে’। তিনি আরও বলেন, ‘বিক্ষোভের স্রোত কীভাবে সামাল দেওয়া যায়, সে বিষয়ে আমরা বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছি। এমন নয় যে আমরা এটিকে একদিনে সীমাবদ্ধ রাখব। এটি বেশ কয়েক দিন ধরেও চলতে পারে। তাই আমরা এই কৌশলগুলোই বিবেচনা করছি।’
ইমরানের নিকটাত্মীয় ও সমর্থকদের ওপর সাম্প্রতিক দমনপীড়নকে ‘প্রাণঘাতী’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, রোববার পুলিশ পাঞ্জাব জনশৃঙ্খলা রক্ষা (এমপিও) আইনের অধীনে লাহোরে ইমরানের বোন আলিমাকে তার বাড়ি থেকে আটক করে। এর কয়েক ঘণ্টা পর কর্তৃপক্ষ তার অন্য দুই বোন উজমা খান ও নুরিন নিয়াজিসহ আরও কয়েকজন আত্মীয়কে আটক করে।
দলীয় নেতারা তাদের ‘অবৈধ হয়রানির’ নিন্দা করেছেন। তারা বলেছেন, রোববারের ‘লং মার্চে’ ইমরানের মুক্তির দাবি জানানো হবে। ক্ষমতাসীন জোট সরকারের অধীনে গণতন্ত্রের অবক্ষয়েরও প্রতিবাদ করা হবে এই মিছিলে।
তবে সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা এই মিছিলকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত পৌঁছাতে দেবে না। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি পিটিআই নেতাদের বিক্ষোভ নিয়ে এগিয়ে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছেন। এই মিছিলে ইমরানের মুক্তি, সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব এবং দেশজুড়ে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক বাবু রাম পান্ত এক বিবৃতিতে বলেন, ‘২৭ সেপ্টেম্বর দলটির পরিকল্পিত দেশব্যাপী বিক্ষোভের আগেই পিটিআই সদস্যদের এই আগাম গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই এই বিক্ষোভ ঠেকানোর অঙ্গীকার করেছেন। ইসলামাবাদে ইতোমধ্যেই রাস্তা অবরোধ করা হচ্ছে।’
বিবৃতিতে মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, ‘শুধুমাত্র পারিবারিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং বিক্ষোভের পরিকল্পনার কারণে যাঁদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষকে তাদের, বিশেষ করে ইমরান খানের আত্মীয়স্বজন ও পিটিআই কর্মীদের, অবিলম্বে মুক্তি দিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আহ্বান জানাচ্ছে।’
ইমরানের সঙ্গে কারাগারে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান সরকার।

