ইউক্রেনের মুসলিমদের অবস্থা কেমন, জানালেন দেশটির প্রধান মুফতি

রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ইউক্রেনের মুসলিম সম্প্রদায় বেশ সমস্যার মধ্যে আছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় নেতা মুফতি মুরাত সুলেইমানভ।
আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের মুসলমানদের ধর্মীয় প্রশাসনের প্রধান এই মুফতি বলেন, ইউক্রেনের মুসলিম সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবন এখন নিয়মিত হামলার কারণে ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি মসজিদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিদিন ইউক্রেনের মুসলমানরা এই আশঙ্কা নিয়ে জীবনযাপন করেন যে, পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্রটি তাদের মসজিদ, বাড়ি বা পাড়ায় আঘাত হানতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণা ও ইসলামি সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনে মুসলমানের সংখ্যা আনুমানিক ৫ থেকে ২০ লাখ। ইউরোপের অনেক দেশের মতো সেখানে মুসলমানদের বড় অংশ অভিবাসী নয়; বরং তারা দেশটির স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশ। ক্রিমিয়ান তাতাররা ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় মুসলিম সম্প্রদায়।
সুলেইমানভ জানান, বাখমুত, সিভেরোদোনেৎস্ক ও কস্তিয়ান্তিনিভকায় মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মুসলমান অন্য এলাকায় চলে গেছেন, যাতে সেখানকার মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে থেকে ধর্মীয় কাজে অংশ নিতে পারেন। নামাজ, জানাজা ও অন্যান্য ধর্মীয় বিধিবিধান মানতে পারেন। তবে যুদ্ধের কারণে নানা সমস্যায় পড়লেও অনেক মুসলমান ইউক্রেনেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ তারা নিজেদের দেশটির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন।
সুলেইমানভ বলেন, যারা ইউক্রেনে থেকে গেছেন, তারা বুঝতে পারছেন যে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারাও ইউক্রেনীয় সমাজের অংশ।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ শোনা এবং অবিরাম গোলাবর্ষণের মধ্যে বসবাস যখন দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়, তখন সবাই চায় যুদ্ধের অবসান হোক এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক।
তবে, এই যুদ্ধ দেশের ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর সম্পর্ককেও নতুন রূপ দিয়েছে। মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে বলে জানান এই মুফতি।
সুলেইমানভ বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতকে অনেক সময় দুটি প্রধানত খ্রিষ্টান দেশের মধ্যকার যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয়। এ কারণে কেউ কেউ ভেবেছিলেন, মুসলমানরা হয়তো নিরপেক্ষ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে ইউক্রেনের মুসলিম সম্প্রদায় স্পষ্টভাবে দেশের পাশে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, এর ফলে খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
রাশিয়া মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে প্রচারণার আশ্রয় নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে—এমন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করছে রাশিয়া।
সুলেইমানভ বলেন, আমাদের শক্তি আমাদের ঐক্যের মধ্যে, আর এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোনো বিশপ, পুরোহিত, মুফতি ও ইমাম একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের পক্ষে একই কণ্ঠে কথা বলেন, তখন আমরা এই ঐক্যই তুলে ধরি।
ইউক্রেনের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে যে ন্যায়বিচার ও ঐক্যের নীতি এক করেছে, অন্যান্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সেই নীতি অনুসরণ করা উচিত বলে মনে করেন সুলেইমানভ।
তিনি বলেন, ইউক্রেনের মুফতি এবং একজন মুসলমান হিসেবে ফিলিস্তিন ও গাজায় ‘গণহত্যা’ নিয়ে কথা বলাও তার দায়িত্ব।
সুলেইমানভের মতে, ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে বাছাই করা দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত নয়। যুদ্ধ বন্ধে বিশ্বনেতাদের সংলাপের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মুসলিম বিশ্বের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ইউক্রেনের মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সমর্থনের কথা তারা শুনতে পান। তবে ইউক্রেনের মুসলমানদের নিয়ে আরও বেশি কথা বলা হোক—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
তুরস্কের ধর্মবিষয়ক অধিদপ্তর দিয়ানেতের সঙ্গেও আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আশা প্রকাশ করেন সুলেইমানভ। সম্পর্ক আরও গভীর করতে তিনি ‘সম্ভব সব ধরনের চেষ্টা’ করছেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, ইউক্রেনের মুসলমানদের সহায়তা দেওয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দিয়ানেত সহযোগিতা করছে। ভবিষ্যতে দুই পক্ষের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হবে এবং পারস্পরিক আস্থা আরও বাড়বে—এটাই তার আন্তরিক প্রত্যাশা।

