logo

‘নীল সুনামিতে’ ডেমোক্র্যাটদের জয় বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে ইসরায়েলি মিডিয়া

‘নীল সুনামিতে’ ডেমোক্র্যাটদের জয় বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে ইসরায়েলি মিডিয়া
ইসরায়েলের তেল আবিবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্পর ছবি সম্বলিত নির্বাচনী বিলবোর্ড। ছবি: গেটি ইমেজেস

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো। এমন এক সময়ে এই পরিবর্তন ঘটল, যখন ইসরায়েলের নীতি ও দেশটিকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তার সমালোচক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের প্রভাব বাড়ছে।

মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর বুধবার (৪ নভেম্বর) এসব মূল্যায়ন প্রকাশ করে ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো। তবে চূড়ান্ত ফল নির্ধারণের জন্য কয়েকটি রাজ্যে তখনও ভোট গণনা চলছিল।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো এই ফলাফলকে ‘নীল সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির রাজনৈতিক রং নীল। এই শব্দবন্ধ দিয়ে দলটির বড় সাফল্য বোঝানো হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছে সংবাদমাধ্যমগুলো।

নির্বাচনের ফল ইসরায়েলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে: মারিভ

ইসরায়েলের সংবাদপত্র মারিভ তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘শুধু ট্রাম্পই পরাজিত নন; নির্বাচনের ফল ইসরায়েলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। তবে এই ফল ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্কের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।’

পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে, ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তার বিরোধী এবং গাজায় দেশটির নীতির সমালোচক প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা কংগ্রেসে আসন পেয়েছেন। এতে দলের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলনীতি পরিবর্তনের পক্ষে থাকা একটি ধারা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

প্রতিবেদনে মেইনে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসনের বিজয়ের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। কলিন্স ১৯৯৭ সাল থেকে ওই আসন ধরে রেখেছিলেন এবং ইসরায়েলের অন্যতম বিশিষ্ট সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

মারিভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার সময় জ্যাকসন ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

পত্রিকাটির মতে, এই ফল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন তুলে ধরেছে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের প্রতি দলটির নীতি পরিবর্তনে নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে এতে মার্কিন নীতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ট্রাম্পের জন্য লজ্জাজক পরাজয়: ইয়েদিওথ আহরোনোথ

ইসরায়েলের আরেক সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথ তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘ট্রাম্পের জন্য লজ্জাজনক পরাজয়: ঐতিহাসিক নীল সুনামিতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের জয়।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বড় বিজয় অর্জন করেছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছে। জনমত জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, তারা শুধু প্রতিনিধি পরিষদেই নয়, সিনেটেও জয় পেয়েছে।’

পত্রিকাটি আরও জানিয়েছে, আগে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকাতেও আসন পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। এতে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর তার কর্মকাণ্ড সীমিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ফল ট্রাম্প প্রশাসনকে ‘ল্যাম ডাক’ পরিস্থিতিতে ফেলবে। অর্থাৎ, বিরোধী দল আইনসভার নিয়ন্ত্রণে থাকায় প্রেসিডেন্টের পক্ষে আইন ও সিদ্ধান্ত পাস করানো কঠিন হয়ে পড়বে।

নতুন কংগ্রেস ইসরায়েলের আরও সমালোচক: ইসরায়েল হায়োম

ইসরায়েলের সংবাদপত্র ইসরায়েল হায়োম বলেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনছে এবং ইসরায়েলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

পত্রিকাটির ভাষ্য অনুযায়ী, কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে জানুয়ারি থেকে দলটি আইন প্রণয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ আটকে দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার সুযোগ পাবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরাতে শুরু করায় ইসরায়েলকে আরও বেশি সমালোচনামূলক কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে।’

ইরানের সঙ্গে সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা এবং কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন এমন আঞ্চলিক চুক্তির বিষয়গুলো হোয়াইট হাউসের সঙ্গে মতবিরোধের কারণ হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে পত্রিকাটি।

সামরিক সহায়তার বিষয়ে প্রতিবেদনে ট্রাম্পের সেই ঘোষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তিনি চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক মার্কিন সহায়তা বন্ধ করার কথা জানিয়েছিলেন।

পত্রিকাটি বলেছে, ইসরায়েলি তহবিল দিয়ে অর্থায়ন করা হলেও দেশটির কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি কংগ্রেসের তত্ত্বাবধানের আওতায় থাকবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা করে তিনি চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক মার্কিন সহায়তা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছেন। তবে কীভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।

ইসরায়েল হায়োমের ভাষ্য, ‘প্রতিকূল একটি কংগ্রেস ইসরায়েলের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি কংগ্রেসের সহযোগিতা প্রয়োজন এমন উদ্যোগগুলোও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’

পত্রিকাটি পূর্বাভাস দিয়েছে, কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে মার্কিন নীতির ওপর চাপ তৈরির মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।

নতুন প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিয়ার অন্তত পাঁচজন সদস্য থাকবেন বলেও উল্লেখ করেছে পত্রিকাটি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের। মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, ‘শুধু সামরিক সহায়তা বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়।’

ইসরায়েল হায়োম ইসরায়েলকে শুধু ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নির্ভর না করে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট, উভয় দলের সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছে।

ট্রাম্প ও ইসরায়েলের জন্য বড় ধাক্কা: চ্যানেল ১৪

ইসরায়েলের ডানপন্থি টেলিভিশন চ্যানেল ১৪, যা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, নির্বাচনের ফলাফলকে ‘ট্রাম্প ও ইসরায়েলের জন্য বড় আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

চ্যানেলটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক কংগ্রেসীয় তদন্তের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা বিচারক, রাষ্ট্রদূত এবং প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন।

পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বরাদ্দবিষয়ক কমিটিগুলোর নেতৃত্ব ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ইসরায়েলের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে চ্যানেলটি।

তাদের পূর্বাভাস, ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রির চুক্তি ও চালানের ওপর কড়াকড়ি নজরদারি বাড়বে। একই সঙ্গে ইরানের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক নীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

সূত্র: আনাদোলু

সৈয়দ মুহাম্মদ আজম

সম্পাদনা

সৈয়দ মুহাম্মদ আজম

সহ-সম্পাদক | এশিয়া পোস্ট