বাংলাদেশ নিয়ে ব্রিটেনের নতুন প্রতিবেদন, প্রভাব পড়তে পারে আশ্রয় আবেদনে

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় স্থিতিশীল ও উন্নত হয়েছে। তবে দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা, পুলিশের জবাবদিহি এবং গণঅভ্যুত্থানের পর প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ৮৬ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ১৯ অক্টোবর হালনাগাদ করা প্রতিবেদনে নতুন নীতিগত নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন মূল্যায়ন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে যুক্তরাজ্য।
প্রতিবেদন তৈরির জন্য যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের (সিপিআইটি) তিন কর্মকর্তা ৭ থেকে ১৫ জুন বাংলাদেশ সফর করেন। তারা রাজনৈতিক দল, পুলিশ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনি সহায়তা সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন। মোট ১৫টি সাক্ষাৎকারে ২৪ জনের বক্তব্য নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় স্থিতিশীল হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়।
রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের তুলনায় এখন তারা কার্যক্রম পরিচালনা, মতপ্রকাশ এবং জনপরিসরে বিতর্কে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছে। তবে দুর্নীতি, পুলিশের জবাবদিহি ও কার্যকারিতা এবং গণঅভ্যুত্থানের পর প্রস্তাবিত ব্যাপক সংস্কার বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল সংগঠিত হওয়া, প্রচারণা চালানো, প্রতিবাদ করা এবং সরকারের সমালোচনা করতে পারছে। রাজনৈতিক সহিংসতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে তা সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাব, ব্যবসায়িক স্বার্থ, সম্পদ ও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে এসব ঘটনা ঘটছে।
সূত্রগুলো ২০২৬ সালের নির্বাচনকে সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম সহিংস বলে বর্ণনা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মতে, নির্বাচনের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা কমেছে।
তবে দুর্নীতি, পুলিশের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর নেওয়া বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়নের গতিও ধীর বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ নিয়ে যা বলা হয়েছে
ক্ষমতায় থাকাকালে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের কারণে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ রয়েছে। দলটির প্রতি জনসাধারণের বিরূপ মনোভাবও রয়েছে। দুর্নীতি, সহিংসতা বা দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িত নন, এমন তৃণমূল পর্যায়ের আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা সাধারণত নিজ নিজ এলাকায় থাকতে পারছেন।
তবে প্রকাশ্যে দলটির প্রতি সমর্থন জানালে তারা হয়রানি, সামাজিক বৈরিতা বা সহিংসতার শিকার হতে পারেন। আওয়ামী লীগের কিছু সাবেক সদস্য অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন, দেশের অন্য এলাকায় চলে গেছেন অথবা কেউ কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছেন এবং বেশির ভাগ মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ২১ হাজারের বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পুরোনো মামলাগুলোর পর্যালোচনাও চলছে।
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিক্ষোভ চলাকালে কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও কর্মকর্তা ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ও সাধারণ আদালতে এসব মামলার বিচার চলছে। কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেলেও অন্যরা বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটক রয়েছেন।
রাজনৈতিক আশ্রয়ে নতুন নির্দেশনা
বাংলাদেশ নিয়ে ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত নতুন নীতিগত নির্দেশনায় যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদন নিয়েও অবস্থান স্পষ্ট করেছে হোম অফিস।
এতে বলা হয়েছে, শুধু কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সমর্থক হওয়ার কারণে বাংলাদেশে নিপীড়নের বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে— সাধারণভাবে এমনটি ধরে নেওয়া যায় না। তবে কোনো ব্যক্তি তার নিজস্ব পরিস্থিতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে আলাদা ঝুঁকি প্রমাণ করতে পারেন। প্রতিটি আবেদন ব্যক্তিগতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
উচ্চপর্যায়ের সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারকে রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নিপীড়নের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলেও নির্দেশনায় বলা হয়েছে। তবে যথাযথ বিচার না পাওয়া, বৈষম্যমূলক মামলা বা অমানবিক শাস্তির বাস্তব ঝুঁকি থাকলে তা আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে সেটি যুক্তরাজ্যের আইনে ‘স্পষ্টত ভিত্তিহীন’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর অর্থ বিএনপির সব সদস্য বা সমর্থকের আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে এমন নয়। প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি ও প্রমাণ আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ব্রিটিশ হোম অফিসের নতুন মূল্যায়নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উন্নতির কথা বলা হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বেড়েছে, সহিংসতা কমেছে এবং বহু পুরনো মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নিরাপত্তা, পুলিশের জবাবদিহি, দুর্নীতি ও সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগও রয়ে গেছে।
এ মূল্যায়ন যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক আশ্রয় ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।



(2)-6182f1.jpg)