logo

পশ্চিম তীর ধ্বংসে ইসরায়েলের নতুন অস্ত্র এআই

পশ্চিম তীর ধ্বংসে ইসরায়েলের নতুন অস্ত্র এআই
অধিকৃত পশ্চিম তীরের ‘খিরবেত হুমসা’-তে তাঁবু গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ছবি: এএফপি

বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জীবনমান উন্নয়নে সহায়তাকারী থেকে মানব সভ্যতা ধ্বংসের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করছে, ঠিক তখন ইসরায়েল নিজেদের সামরিক অস্ত্রভান্ডারের অংশ হিসেবে এআ ব্যবহারের কাজ এগিয়ে নিয়েছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় বোমা হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ কিংবা শনাক্ত করতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ইসরায়েল শুধু গাজাতেই নয়, বরং অধিকৃত পশ্চিম তীরেও বসতি স্থাপন ও ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্যবস্তু করতে এআই ব্যবহার করছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) প্রযুক্তি গবেষক ও মানবাধিকরকর্মীদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। সম্প্রতি পুরস্কারপ্রাপ্ত তথ্যচিত্র ‘নাজা’-তেও এআই প্রযুক্তির ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ভূমি জরিপ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ত্বরান্বিত করতে এআই পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে গবেষকদের দাবি।

মানবাধিকারকর্মী ও ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে তুরস্কের সংবাদমাধ্যম পালডিজিটাল জানিয়েছে, ইসরায়েল বিশাল এলাকা নজরদারি এবং বিভিন্ন পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম ব্যবহার করে। এর মধ্যে ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের তৈরি ‘ইমিসাইট’ নামের একটি পণ্যও রয়েছে। পরে এসব তথ্য ধ্বংসযজ্ঞের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।

গত জুলাই মাসে পালডিজিটাল জানায়, ইসরায়েল প্রথমে নাকাব মরুভূমিতে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের বেদুইন ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা। অনেক বেদুইন এমন গ্রামে বসবাস করেন, যেগুলো ইসরায়েলি সরকার স্বীকৃতি দেয়নি। এসব এলাকায় কর্তৃপক্ষ খুব কমই ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়। এসব পদক্ষেপ বৈষম্যমূলক। এর লক্ষ্য বেদুইন সম্প্রদায়কে জোর করে উচ্ছেদ করে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপন করা বলে দাবি বিক্ষুব্ধদের।

পালডিজিটালের মতে, অনেক ক্ষেত্রে এআই প্রযুক্তি যখন এমন কোনো অননুমোদিত স্থাপনা শনাক্ত করত, তখন সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে বুলডোজার পাঠানো হতো। ইসরায়েল এখন এই প্রযুক্তি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও নিয়ে এসেছে। সেখানে বছরের পর বছর ধরে নির্মাণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। অথচ এসব এলাকায় ফিলিস্তিনিদের নির্মাণের অনুমতি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

২০২৫ সালের এপ্রিলে পশ্চিম তীরে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইসরায়েল ল্যান্ড অথরিটির একটি প্রয়োগকারী ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা পিস নাউ এই পদক্ষেপকে ‘দখলদারির একটি পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ভূমি অধিকার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এই সংস্থা ‘অনধিকার প্রবেশ শনাক্ত করার জন্য এআইভিত্তিক উন্নত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম’ ব্যবহার করে।

উপনিবেশ ও প্রাচীর প্রতিরোধ কমিশনের নথিপত্র ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান আমির দাউদ আলজাজিরাকে বলেন, ইউনিটটি গঠন একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ ছিল। আমরা নাকাবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পরীক্ষিত একটি নজরদারি ও উচ্ছেদ মডেল অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্থানান্তরের কথা বলছি। পশ্চিম তীরের অভ্যন্তরে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইসরায়েলি ভূমি কর্তৃপক্ষের অধিভুক্ত একটি জেলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই রাজনৈতিক বিপদ শুরু হয়। এর অর্থ হলো, একটি অধিকৃত ভূখণ্ডে সরাসরি একটি ইসরায়েলি বেসামরিক সরকারি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।

মন্তব্যের জন্য আলজাজিরা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও ইমিসাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এজ কম্পিউটিংয়ে নজরদারি

ইমিসাইটের মতো এআই প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি স্যাটেলাইট প্রযুক্তির অগ্রগতিও আকাশ থেকে তোলা ছবি প্রক্রিয়াকরণের গতি বাড়াচ্ছে। ফিলিস্তিনি ডিজিটাল মিডিয়া ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ খালেদ সাফি আলজাজিরাকে বলেন, এই প্রযুক্তি প্রচলিত মানবিক তত্ত্বাবধানের বিলম্ব এড়িয়ে ছবি প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। নতুন স্যাটেলাইটগুলো এখন কক্ষপথে থাকা অবস্থাতেই এআই ব্যবহার করে ছবি প্রক্রিয়া করতে পারে।

সাফি বলেন, ‘যখন স্যাটেলাইটের ভেতরেই শক্তিশালী কম্পিউটার চিপ ও এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হলো, তখন এটি কার্যত স্যাটেলাইটটিকে মহাকাশে পরিচালিত একটি এজ কম্পিউটিং টার্মিনালে পরিণত করে।’ তিনি এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলছিলেন, যেখানে ডেটা কোনো ডেটা সেন্টারে পাঠানোর পরিবর্তে যেখানে তৈরি হয়, সেখানেই প্রক্রিয়া করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘এটি ছবি তোলে, তা বিশ্লেষণ করে, পরিবর্তন ও গুরুত্বপূর্ণ বস্তু শনাক্ত করে এবং তারপর ফলাফল বা শুধু গুরুত্বপূর্ণ অংশটি পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়।’

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানায়, ইমিসাইট নামের একটি সংস্থা ভূমি কর্তৃপক্ষকে নাকাব অঞ্চলে ১০ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা জরিপ করার সুযোগ দিয়েছিল। এই কার্যক্রম ইসরায়েলের ২ হাজার ৬০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বেদুইন নাগরিককে জোরপূর্বক উচ্ছেদের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

সেই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এখন পশ্চিম তীরে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

২০১০ থেকে ২০২২ সাল এবং ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের পরিস্থিতির তুলনা করে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা পিস নাউ ও কেরেম নাভোট জানিয়েছে, পশ্চিম তীরের ‘সি’ এলাকা এবং অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ধ্বংসযজ্ঞ ৮০ শতাংশ বেড়েছে। এসব এলাকা পুরোপুরি ইসরায়েলি সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ২০২৩-২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৯৬৬টি ভবন ধ্বংস করা হয়েছে। ২০২৫ সালে এই ধ্বংসযজ্ঞ আরও বেড়ে যায়। ওই বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী ১ হাজার ২৮৮টি ফিলিস্তিনি স্থাপনা ধ্বংস করে।

দাউদ বলেন, “এখানকার অ্যালগরিদমটি একটি ‘শক্তি গুণক’ হিসেবে কাজ করে। এটি বিশাল এলাকা স্ক্যান করে, লক্ষ্যবস্তুগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়, সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করে এবং সতর্কতা ও ধ্বংসযজ্ঞে দ্রুততর রূপান্তরে সহায়তা করে। সরকার চূড়ান্ত স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় এবং অ্যালগরিদমটি তা বাস্তবায়নের খরচ কমিয়ে দেয়।”

স্বয়ংক্রিয় ব্যবহার

এই এআই ব্যবস্থাকে আরও তথ্য সরবরাহ করছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের একটি বড় অর্থায়নে পরিচালিত স্থল টহল দল। তারা অবৈধ ফাঁড়িগুলোকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ২০২৩ সালে ইসরায়েলি সরকার বসতি স্থাপনকারীদের টহল দলের জন্য ৩ কোটি ৩০ লাখ শেকেল বা ৯০ লাখ ডলার এবং ফাঁড়িগুলোকে ড্রোন ও ক্যামেরা দিয়ে সজ্জিত করার জন্য ৪ কোটি শেকেল বা ১ কোটি ৩২ লাখ ডলার বরাদ্দ করেছিল।

‘মানবীয় হস্তক্ষেপবিহীন’ পদ্ধতির গুরুতর নৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন সাফি। তার মতে, এই ব্যবস্থায় কোনো মানবিক পর্যালোচনা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘সমস্যাটি হলো একটি মারাত্মক সিদ্ধান্তকে শূন্য ও একের মধ্যে এবং একটি সংখ্যা, একটি ছবি ও ডেটার মধ্যে একটি সম্ভাবনার সমীকরণে রূপান্তর করা। এটি অপরাধীকে দায় এড়িয়ে যাওয়ার এবং তা থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। ফলে দায়টি অ্যালগরিদম, প্রতিষ্ঠান অথবা অন্য কোনো অজানা সত্তার ওপর গিয়ে পড়ে।’

প্রযুক্তির এই ব্যবহার অভূতপূর্ব বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশিই ঘটছে। ২০২৩-২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি সরকার ৪০ হাজারের বেশি বসতি স্থাপনকারী আবাসন ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছে এবং ১৮৫টি নতুন ঘাঁটি স্থাপন করেছে। লেখাটিতে এগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ বলা হয়েছে। অন্যদিকে, একই সময়ে ইসরায়েল পশ্চিম তীরজুড়ে ১১৮টি ফিলিস্তিনি মেষপালক সম্প্রদায়কে বিতাড়িত করার তদারকি করেছে।

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় এবং পিস নাউয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অধিকৃত অঞ্চলে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতায় বসতি স্থাপনকারীদের হামলা শুধু ২০২৫ সালেই রেকর্ডসংখ্যক ১ হাজার ৮৩৬টিতে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে ‘সি’ এলাকায় একটি অনলাইন ভূমি রেজিস্ট্রি চালু করা হয়েছে। উপনিবেশ স্থাপন ও প্রাচীর প্রতিরোধ কমিশনসহ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই উদ্যোগের নিন্দা করেছে। তাদের মতে, এটি প্রশাসনিক অধিগ্রহণ চূড়ান্ত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া একটি ডিজিটাল কৌশল।

এই স্বয়ংক্রিয় প্রয়োগ ব্যবস্থার চরম দ্বৈত নীতির দিকে ইঙ্গিত করে দাউদ এটিকে বিভাজনের একটি চালিকাশক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দাউদ বলেন, ‘ফিলিস্তিনি ভবনটি দ্রুত শনাক্ত করে দ্রুত ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়ায় ঠেলে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ঔপনিবেশিক ঘাঁটিটিকে অর্থায়ন করা হয়, পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং তারপর পূর্ববর্তী তারিখ থেকে কার্যকর করে সেটিকে বৈধ করার জন্য কাজ করা হয়।’

পশ্চিম তীরে ইমিসাইটের মোতায়েন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য দ্বৈত ও লাভজনক উদ্দেশ্য সাধন করে বলে সাফি সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড শুধু একটি নজরদারির স্থানই নয়, বরং দখলদারদের জন্য মাঠে এই সমস্ত অভিযান চালানোর একটি সুস্পষ্ট পরিবেশ। এটি সর্বোচ্চ প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তার অ্যালগরিদমগুলোকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং সেগুলোকে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর কাছে বিক্রি ও বিশ্বব্যাপী বিপণনের জন্য প্রস্তুত করে।’