logo

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অনড় রাশিয়া, জি-২০ বৈঠকে পশ্চিমাদের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ

এএফপি
এএফপি
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অনড় রাশিয়া, জি-২০ বৈঠকে পশ্চিমাদের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় জি-২০ জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শুরু হলেও ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ছবি: এএফপি

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় জি-২০ জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শুরু হলেও ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের বক্তব্য ঘিরে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে লাভরভের বক্তব্যকে ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ বলে আখ্যা দেন।

বৈঠকের ফাঁকে এএফপিকে কালাস বলেন, লাভরভ অনেক মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। তবে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা সেসব বক্তব্যের যথাযথ জবাব দিতে পেরেছেন।

এদিকে, কৃষিপণ্য রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের জন্য মস্কোর ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা। অন্যদিকে লাভরভের বক্তব্যকে বেশ ‘উসকানিমূলক’ বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপের এক কূটনৈতিক সূত্র।

সংবাদ সম্মেলনে লাভরভ ইউরোপীয় দেশগুলোর ‘অহংকারী বর্জননীতি’র সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের আগ্রহের প্রশংসা করেন তিনি।

বৈঠকে জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রচলিত যৌথ ছবি তোলার আয়োজনও বাতিল করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, লাভরভের সঙ্গে একই ছবিতে থাকতে আপত্তি জানান ইউরোপের কয়েকটি দেশের কর্মকর্তা।

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধের অবসান হয়নি। চলতি বছর জি-২০-এর অন্যান্য আয়োজনেও রুশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যৌথ ছবি তুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ইউরোপীয় নেতারা।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, আনুষ্ঠানিক ছবি তোলার আয়োজন বাতিল করা হয়েছে, যাতে এ ধরনের একটি ছবি কূটনৈতিক আলোচনার মূল বিষয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে না দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক দিন আগে আটলান্টায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরে ফ্লোরিডার মায়ামিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ডোরাল রিসোর্টে অনুষ্ঠেয় জি-২০ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে।

তবে বৈঠকটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর তেহরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করে।

যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য ঘাটতি এবং জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব দিতে চাইলেও বৈঠক থেকে বড় কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখছেন না পর্যবেক্ষকরা। চূড়ান্ত যৌথ ঘোষণার পরিবর্তে দুই দিনের আলোচনা শেষে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি সভাপতিমণ্ডলীর সারসংক্ষেপ প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।

রুবিও-লাভরভের বৈঠককে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা

বৈঠকের উদ্বোধনী অধিবেশনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, আন্তসংযুক্ত অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্ব এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের মুহূর্তে’ দাঁড়িয়ে আছে।

তিনি জি-২০ সদস্যদেশগুলোকে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, জাপান ও রাশিয়াসহ বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলো এই জোটের সদস্য।

রুবিও বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে অবাধ চলাচলের স্বাধীনতার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদস্যদেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।

বৈঠকের ফাঁকে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন রুবিও। পরে লাভরভ জানান, তাঁদের মধ্যে ‘সন্তোষজনক আলোচনা’ হয়েছে।

ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ দেশ রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন লাভরভও।

জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে কোনো কিছুই আর স্বাভাবিক নেই।’ তিনি আরও জানান, কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ইউক্রেনের দেওয়া প্রস্তাব মেনে নিতে রাশিয়ার প্রতি আবারও আহ্বান জানানো হবে।

আটলান্টায় রুবিও ও লাভরভের যোগাযোগ বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে মস্কোর সহযোগিতাও চাইছে ওয়াশিংটন। আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে জ্বালানির মূল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু।

জি-২০ বৈঠকে লাভরভের অংশগ্রহণের আগে আগামী নভেম্বর মাসে মস্কো, কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন দফার আলোচনার কথা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছর জি-২০-এর বিভিন্ন আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র রুশ কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে, জোটের সদস্য দক্ষিণ আফ্রিকাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে লাভরভের উপস্থিতি খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিল না।

ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে মার্কিন নাগরিকদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ায় রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার একটি চুক্তির কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। একই সঙ্গে মস্কোর ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করেছেন।

আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তায় গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

জি-২০ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক নৌপথে অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, জরুরি সংকট মোকাবিলা এবং কোনো ধরনের হুমকি বা টোল ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সচল রাখতে দেশগুলোর অভিন্ন অঙ্গীকার রয়েছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে পারে। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ইরান পরিস্থিতিও জি-২০ বৈঠকের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।