মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরানের জন্য হুমকি না সুযোগ?

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন এক সমীকরণের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার সংকট এবং ইসরায়েলের আঞ্চলিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে এ ধরনের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তিন দেশ বলেছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং এর লক্ষ্য বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানো।
তুরস্ক জানিয়েছে, মক্কা চুক্তি ন্যাটোর বিকল্প নয়। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নিজেদের ভূমিকা বাড়াতে এ চুক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে দেখছে দেশটি।
চুক্তিতে তিন দেশের অংশগ্রহণের পেছনে অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতাকে তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখে। সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে জোটের মাধ্যমে ইসলামি বিশ্বে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায় ইসলামাবাদ। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রভাবও বাড়িয়েছে পাকিস্তান।
তুরস্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। ন্যাটোর সদস্য হলেও দেশটি পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নিজেদের ভূমিকা বাড়াতে চাইছে। মক্কা চুক্তিকে তাই ন্যাটোর বিকল্প নয়, বরং অতিরিক্ত কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে আঙ্কারা।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলন। বাব আল-মান্দাব প্রণালির নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইয়েমেনের হুমকি মোকাবিলায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের সহযোগিতা পাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে রিয়াদ। একই সঙ্গে সৌদি ভূখণ্ডে ইরানের হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে তুরস্ক ও পাকিস্তানের অংশগ্রহণকে প্রতিরোধমূলক শক্তি হিসেবেও কাজে লাগাতে পারে সৌদি আরব।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমছে?
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর হিসাব-নিকাশেও পরিবর্তন এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কেনার পরও উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে, ওয়াশিংটন তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বিশেষ করে ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগে আরব দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর আলোচনা জোরালো হয়েছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করতে আগ্রহী।
এই পরিস্থিতিতে মক্কা চুক্তি যদি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির সূচনা করে, তাহলে তা আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
ইসরায়েলকে ঘিরেও বাড়ছে উদ্বেগ
মক্কা চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসরায়েলের সাম্প্রতিক তৎপরতা। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ ধারণা, লেবানন, সিরিয়া ও জর্ডান নিয়ে বিভিন্ন হুমকি এবং কাতারে হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গাজা দখল ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতাও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান জোরালো করছে।
মক্কা চুক্তির তিন স্বাক্ষরকারী দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর। তুরস্কও সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের অন্যতম সোচ্চার সমালোচক। সৌদি আরবও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ফলে চুক্তির সদস্যদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান আরও শক্তিশালী হলে ভবিষ্যতে অন্য আরব ও মুসলিম দেশগুলোও এ জোটে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখাতে পারে।
ইরানের জন্য সুযোগ নাকি হুমকি?
মক্কা চুক্তি ইরানের জন্য একই সঙ্গে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ এবং কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান বিদেশি শক্তির সামরিক উপস্থিতি ছাড়াই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
ইরানের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভরশীলতার পরিবর্তে প্রতিবেশী দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে তোলা হলে সেটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে।
ইরানের সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গেও সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে তেহরান। ফলে ইরান চাইলে এই চুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে।
ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলাকে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে শত্রুতার প্রকাশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। বরং তেহরান বলছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করার কোনো নীতি তাদের নেই।
এ পরিস্থিতিতে মক্কা চুক্তি যদি কেবল তিন দেশের প্রতিরক্ষা জোটে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর মুসলিম ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তি হয়ে ওঠে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। ইরানও সক্রিয় কূটনীতির মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

