ফায়ারিং স্কোয়াডে ফোর্ট হুড হামলাকারীর মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের ঘোষণা পেন্টাগনের

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ১৩ সেনাকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা ঘিরে আইনি বৈধতা ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। হেগসেথও বলেছেন, সাধারণ মানুষ যেন এটি দেখতে পারেন, তা নিশ্চিত করা হবে।
রক্ষণশীল টেলিভিশন চ্যানেল ‘রিয়েল আমেরিকা’স ভয়েস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হেগসেথ বলেন, হাসানকে সেনাসদস্যদের ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, ‘এটাই হওয়া উচিত।’
হেগসেথ আরও বলেন, এ ধরনের অপরাধের গুরুতর পরিণতি রয়েছে—মানুষের তা বোঝা প্রয়োজন।
পেন্টাগন এর আগে জানিয়েছিল, ছয় দশকেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড ঘাঁটিতে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা রয়েছে।
তবে তাঁর দণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। ফলে নির্ধারিত তারিখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
২০০৯ সালে ফোর্ট হুডে ১৩ সেনাকে হত্যা
ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা হাসান ছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটির একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে গুলি চালিয়ে ১৩ জন নিরস্ত্র সেনাকে হত্যা করেন তিনি। আহত হন আরও অনেকে।
ওই সময় চিকিৎসা পরীক্ষা ও টিকা নেওয়ার জন্য মোতায়েনের অপেক্ষায় থাকা সেনাসদস্যরা ভবনটিতে উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ঘাঁটিতে সংঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী অযুদ্ধকালীন হামলা হিসেবে পরিচিত।
আদালতে হাসান হামলাকারী হিসেবে নিজের দায় স্বীকার করেন। ২০১৩ সালে সামরিক আদালতে বিচার চলাকালে তিনি দাবি করেছিলেন, আফগানিস্তানে মুসলিম ও তালেবানদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তিনি ওই হামলা চালিয়েছিলেন। আদালতে তিনি তাঁর ‘যেকোনো ভুলের’ জন্য ক্ষমাও চান।
মৃত্যুদণ্ডের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সুপারিশ করেছিলেন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে অনুমোদন দিয়েছেন।
মার্কিন সামরিক আইনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য প্রেসিডেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। পাশাপাশি উচ্চতর আদালতে আপিল পর্যালোচনা এবং দণ্ডের বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াও রয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের নিয়ে কাজ করা আইনজীবী জন মিলসের মতে, হাসানের আপিলপ্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। তিনি ফেডারেল আদালতে দণ্ড ও সাজা পর্যালোচনার আবেদন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মিলস বলেন, ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা আধুনিক সময়ে নজিরবিহীন এবং এর আইনি ভিত্তি অনিশ্চিত।
তাঁর মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগ মনোযোগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কি না, তা নিয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
ইয়েল ল স্কুলের অতিথি প্রভাষক ইউজিন আর ফিডেলও এই সিদ্ধান্তকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করা মধ্যযুগীয় প্রথার দিকে ফিরে যাওয়ার মতো।
ফিডেল বলেন, হাসান আইনি পদক্ষেপ নিলে মামলার কার্যক্রম কয়েক বছর ধরে চলতে পারে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদেরও পরে গড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড সম্প্রচারের নজির নেই
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় সাংবাদিক বা নির্দিষ্ট সাক্ষীদের উপস্থিত থাকার বিধান রয়েছে। কোথাও কোথাও দণ্ডিত ব্যক্তির আমন্ত্রিত অতিথিরাও উপস্থিত থাকতে পারেন। তবে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি অনলাইনে সম্প্রচারের কোনো পূর্ববর্তী নজির নেই বলে জানিয়েছেন ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা ডেনোর মতে, সরাসরি সম্প্রচার হলে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নজিরবিহীন স্বচ্ছতা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এখনো অর্ধেকের বেশি মানুষ মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে থাকলেও সেই সমর্থন কমছে। মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের সামনে এর বাস্তব প্রয়োগ তুলে ধরার যুক্তিও কেউ দিতে পারেন।
তবে সম্প্রচারটি কীভাবে হবে, দর্শকদের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হবে কি না এবং কোন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এটি দেখানো হবে—এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রচার নিয়ে অনিশ্চয়তা
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে সহিংস ও মৃত্যুর দৃশ্যসংবলিত কনটেন্টের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
মেটার নীতিমালায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সরাসরি সম্প্রচার নিষিদ্ধ। টিকটকও অতিমাত্রায় গ্রাফিক, সহিংস বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে—এমন কনটেন্ট অনুমোদন করে না।
এক্সের নীতিমালায় কারও মৃত্যুর দৃশ্যসংবলিত কনটেন্ট নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে, বিশেষ করে নিহত ব্যক্তির পরিবার বা অনুমোদিত প্রতিনিধির অভিযোগের ভিত্তিতে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ব্যবহারকারীদের জন্য সরাসরি ভিডিও সম্প্রচারের সুবিধা নেই।
বিবিসি সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের সম্প্রচার কোথায় দেখানো হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক মৃত্যুদণ্ডের দীর্ঘ বিরতি
যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ১৯৬১ সালে। ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত এক সেনাসদস্যকে তখন ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। আর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে। এডি স্লোভিক নামের এক সেনাসদস্যকে তখন গুলি করে হত্যা করা হয়।
দেশটিতে ১৭ বছর ধরে ফেডারেল পর্যায়ে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ বছরে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে গত বছরের জানুয়ারিতে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আরোপ করা ফেডারেল মৃত্যুদণ্ড স্থগিতাদেশ বাতিল করেন এবং মৃত্যুদণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে নির্বাহী আদেশে সই করেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের ১৭টি দেশে দুই হাজার ৭০০-এর বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তবে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটেছে মাত্র দুটি দেশে—ইরানে ১১টি এবং আফগানিস্তানে ছয়টি।
ট্রাম্প অতীতে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিরোধিতা করলেও দীর্ঘদিন ধরেই তিনি মৃত্যুদণ্ডের সমর্থক। ১৯৮৯ সালে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে ধর্ষণ ও হামলার অভিযোগে দণ্ডিত পাঁচ কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো তরুণের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন তিনি। পরে ওই পাঁচজন নির্দোষ প্রমাণিত হন।
এখন হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও আইনি সীমা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। তবে আপিলপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় ঘোষিত তারিখে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
