ইউরোপজুড়ে হঠাৎ খাবার-পানি মজুতের নির্দেশ, প্রস্তুত হাসপাতাল

টানা কয়েক বছর ধরে চলা আসা ইউক্রেন যুদ্ধ এবার নিজের গণ্ডি ছাড়াচ্ছে! রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আক্রশের শিকার হতে যাচ্ছে গোটা ইউরোপ। বাল্টিক দেশগুলোর মতো ন্যাটো ভূখণ্ডের একমাত্র সংযোগস্থল সুওয়ালকি গ্যাপ বা করিডরের কাছে সম্প্রতি সামরিক মহড়া চালিয়েছে রাশিয়া। প্রধান সামরিক মিত্র বেলারুশের সঙ্গে এই মহড়ার ফলেই ইউরোপের জনমনে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা জেঁকে বসেছে।
অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কৌশলগত সুওয়ালকি করিডোরের কাছে এই ঘটনায় আটলান্টিকের উভয় পাড়ে সম্ভাব্য রুশ হামলা মোকাবিলার অংশ হিসেবে ন্যাটো জোট ও ইউরোপীয় দেশগুলো জরুরি প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় গোপনীয় গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে নতুন নিরাপত্তা পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করেছেন যে, মস্কো ন্যাটো ভূখণ্ডে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তা কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলে চালানোর চেষ্টা করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে সাধারণ নাগরিকদের জন্য খাদ্য ও পানির মতো জরুরি রসদ মজুতের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জার্মানি সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিজেদের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখছে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পোল্যান্ডে একটি স্থায়ী মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের পথে অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে সাইবার হামলা, অবকাঠামোতে অন্তর্ঘাত, অগ্নিসংযোগ ও ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনার পেছনে রুশ নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সামরিক বিশ্লেষকেরা এটিকে পুতিনের ‘ধূসর অঞ্চলের’ কৌশল হিসেবে দেখছেন। সরাসরি প্রথাগত যুদ্ধ না ডেকেও ন্যাটোর সংকল্প ও জোটের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করার জন্য এই অস্পষ্টতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ধরনের অস্পষ্ট কৌশলের মাধ্যমে ন্যাটোকে চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলাই মস্কোর মূল উদ্দেশ্য।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সামরিক ঝুঁকি তৈরি করেছে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী প্রায় ৬৫ মাইল দীর্ঘ ‘সুওয়ালকি গ্যাপ’। রাশিয়া ও বেলারুশ যদি করিডরটির কোনো অংশে সীমিত সামরিক অনুপ্রবেশ ঘটায় এবং পারমাণবিক যুদ্ধের জুজু দেখায়, তবে লিথুয়ানিয়া বা বাল্টিক অঞ্চলের একফালি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্য ন্যাটোর ৩২টি সদস্য দেশ আদৌ রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামবে কি না, তা পুতিন পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
লিথুয়ানিয়ার ওপর হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স বা জার্মানি সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি নেবে কি না, সেই অনিশ্চয়তাই ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষার জন্য বড় পরীক্ষা।
ইউক্রেনে রাশিয়ার লাগাতার সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে ন্যাটো নিজেদের বেসামরিক ও জাতীয় স্থিতিস্থাপকতার নীতি হালনাগাদ করছে। কেবল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে শক্তি সরবরাহ বজায় রাখা, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার সক্ষমতাকে এখন প্রতিরক্ষার মূল শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই উদ্যোগে ইউক্রেনীয়দের টিকে থাকার কৌশল ও অভিজ্ঞতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে পুতিনকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যায় যে নতুন কোনো আগ্রাসন সেখানে সফল হবে না।
ন্যাটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের অঙ্গীকার ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের মনে কিছু সংশয় রয়ে গেছে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একযোগে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী তিন দশকের স্বস্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতার যুগ শেষ হয়ে গেছে মনে করে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন সরাসরি নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিচ্ছে।
