logo

ঘূর্ণিঝড়ের নাম কে রাখে, কীভাবে ঠিক হয় সেই নাম?

 লাইভমিন্ট
লাইভমিন্ট
ঘূর্ণিঝড়ের নাম কে রাখে, কীভাবে ঠিক হয় সেই নাম?
প্রতীকী ছবি

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ আরও তীব্র রূপ নিয়ে ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশার উপকূলে আঘাত হেনেছে। ঝড়ের তাণ্ডবে ওই অঞ্চলে বেশ কয়েকজন হতাহতের খবর পাওয়া গেছে এবং লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও নানা অবকাঠামো। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে সামনে চলে এসেছে একটি সাধারণ প্রশ্ন, কীভাবে করা হয় এসব ভয়ংকর ঝড়ের নামকরণ?

বুধবার (২৮ অক্টোবর) অন্ধ্রপ্রদেশে আঘাত হানা এই শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে। এ ছাড়া বিশাখাপত্তনম ও বিজয়ওয়াড়াগামী বিভিন্ন ফ্লাইট বাতিল করেছে একাধিক বিমান সংস্থা।

ঘূর্ণিঝড়টির নাম ‘অর্ণব’ কেন?

দুর্যোগপূর্ণ এই ঝড়ের ‘অর্ণব’ নামটি প্রস্তাব করেছিল বাংলাদেশ। ভারতের আবহাওয়া বিভাগের (আইএমডি) আনুষ্ঠানিক তালিকা অনুযায়ী, বাংলায় ‘অর্ণব’ শব্দের অর্থ মহাসাগর বা সাগর।

আবহাওয়াবিদদের মতে, কোনো দেশের প্রস্তাবিত নামের সঙ্গে ঝড়ের তীব্রতা, গতিপথ কিংবা নির্দিষ্ট কোনো দেশে আঘাত হানার কোনো সম্পর্ক থাকে না। আইএমডির নিয়ম মেনে উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনুমোদিত তালিকা থেকেই ক্রমানুসারে এই নামটি চয়ন করা হয়েছে।

অর্ণবের পরবর্তী ১০ ঘূর্ণিঝড়ের নাম

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নামের তালিকা অনুযায়ী, ‘অর্ণবের’ পর পর্যায়ক্রমে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত নামগুলো হলো:

১. মুরাসু: ভারত, ২. আকভান: ইরান, ৩. কানি: মালদ্বীপ, ৪. আমান/ঙামান: মিয়ানমার, ৫. সাইল: ওমান, ৬. সাহাব: পাকিস্তান, ৭. লুলু: কাতার, ৮. গাজির: সৌদি আরব, ৯. গিগুম: শ্রীলঙ্কা, ১০. থিয়ানিয়ত: থাইল্যান্ড।

তবে এই তালিকায় নাম থাকার অর্থ এই নয় যে পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়গুলো নির্দিষ্ট সময়ে সৃষ্টি হবে কিংবা সবগুলোই প্রবল বা অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে। ঘূর্ণিঝড়ের নাম আগে থেকেই নির্ধারিত তালিকা থেকে নেয়া হয়। ঝড়ের তীব্রতা নির্ভর করে তার আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের ওপর।

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়?

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) নির্দেশনা অনুযায়ী, আঞ্চলিক বিশেষায়িত আবহাওয়া কেন্দ্র (আরএসএমসি) এবং ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রগুলো বিশ্বজুড়ে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে থাকে।

বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরসহ উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই দায়িত্ব পালন করে নয়াদিল্লির আইএমডি। ভূপৃষ্ঠসংলগ্ন সর্বোচ্চ একটানা বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৬২ কিলোমিটার বা ৩৪ নট হলে তবেই কোনো আবহাওয়া ব্যবস্থাকে ঘূর্ণিঝড় হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে নাম দেওয়া হয়।

যেভাবে তৈরি হয় নামের তালিকা

উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু হয়। ডব্লিউএমও এবং এসক্যাপের প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত ১৩টি দেশ প্রত্যেকে ১৩টি করে নাম প্রস্তাব করে মোট ১৬৯টি নামের তালিকা তৈরি করেছে। দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন।

নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে ডব্লিউএমওর সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা মানা হয়। আর তা হলো- নামগুলো হতে হবে সংক্ষিপ্ত ও সর্বোচ্চ আট অক্ষরের, উচ্চারণ হতে হবে সহজ ও শব্দগুলো হতে হবে নিরপেক্ষ এবং কোনো নামই যেন ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অনুভূতিতে আঘাত না করে।

আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চলে ধ্বংসাত্মক ঝড়ের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলেও, উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অনুমোদিত তালিকার কোনো নাম একবার ব্যবহারের পর তা আর পুনরাবৃত্তি করা হয় না।

নামকরণের উদ্দেশ্য কী?

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জনসচেতনতা তৈরিতে ঝড়ের সংক্ষিপ্ত ও স্বতন্ত্র নাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে জটিল ভৌগোলিক স্থানাঙ্কের পরিবর্তে সহজে ঝড়কে শনাক্ত করা যায় এবং একই সময়ে একাধিক সিস্টেম তৈরি হলে বিভ্রান্তি কমে। নামকরণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমকে দ্রুত সতর্কবার্তা প্রচার এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে।