যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে হলে সামাজিকমাধ্যমে যা যা করা যাবে না

যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, পরিবার নিয়ে বসবাস কিংবা ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন? তাহলে পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চাকরির কাগজপত্র বা শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি নিজের ‘ডিজিটাল পরিচয়’-এর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, মার্কিন ভিসা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
আপনি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা এক্সে কী লিখেছেন, নিজের সম্পর্কে কী তথ্য দিয়েছেন, লিংকডইনে কোথায় চাকরি দেখিয়েছেন-এসব তথ্য ভিসা আবেদনের তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে আপনার ভিসা প্রত্যাখ্যান বা রিজেক্ট হতে পারে। অন্যদিকে সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ বা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্বেগ তৈরি করে এমন অনলাইন কর্মকাণ্ডও ভিসা না পাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পাঁচ বছরের সামাজিকমাধ্যমের তথ্য
মার্কিন সরকারের নথি অনুযায়ী, নির্ধারিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে আবেদনকারী গত পাঁচ বছরে যেসব পরিচয় বা হ্যান্ডেল ব্যবহার করেছেন, সেগুলোর তথ্য (সোশ্যাল মিডিয়া আইডেন্টিফায়ার) চাওয়া হয়। ‘সোশ্যাল মিডিয়া আইডেন্টিফায়ার’ বলতে মূলত কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে ব্যবহৃত নাম, ইউজার নেম, ওয়েবসাইট বা আইডি লিংক বা হ্যান্ডেলকে বোঝানো হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল আর পাসওয়ার্ড এক জিনিস নয়। ভিসা আবেদনকারীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড দেওয়ার নিয়ম হিসেবে এটি চালু হয়নি। চাওয়া হয় নির্ধারিত প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত পরিচয় বা হ্যান্ডেল।
কারা সামাজিকমাধ্যমের তথ্য দেন
২০১৯ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, অধিকাংশ অভিবাসী ও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীকে সামাজিকমাধ্যমসংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। তবে কিছু কূটনৈতিক ও সরকারি ভিসার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল। সামাজিকমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছিল, এটি আবেদনকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তা যাচাই আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
কোন কোন সামাজিকমাধ্যম?
DS-160-এ আবেদনের সময় নির্দিষ্ট সামাজিকমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের তালিকা দেওয়া থাকে। আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহৃত সামাজিকমাধ্যমগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া আইডেন্টিফায়ার বা লিংক বা ইউজার নেম দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স/টুইটার, লিংকডইন, ইউটিউব, রেডইট, টাম্বলার, ফ্লিকার, সিনা উইবো, টেনসেন্ট উেইবো ইত্যাদি।
তবে এখানে আরেকটি সতর্কতা জরুরি। প্ল্যাটফর্মের তালিকা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। মার্কিন সরকারের ফেডারেল রেজিস্ট্রারে প্রকাশিত নথিতেও বলা হয়, প্রয়োজন অনুযায়ী এই তালিকায় প্ল্যাটফর্ম যোগ বা বাদ দিতে পারে পররাষ্ট্র দপ্তর। এ জন্য ভিসা আবেদন করার সময় DS-160-এ যে তালিকা দেখানো হবে, সেটিই অনুসরণ করতে হবে।
সামাজিকমাধ্যমের তথ্য কে কে দেখে?
সামাজিকমাধ্যমের তথ্য কে কে দেখে সে বিষয়ে ২০১৯ সালের একটি সরকারি নথি থেকে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। সেখানে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, DS-160-এর সামাজিকমাধ্যমসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনার জন্য আলাদা কোনো একটি কেন্দ্রীয় অফিস ছিল না। কনস্যুলার কর্মকর্তারা DS-160-এর অন্যান্য তথ্যের মতোই এসব তথ্য পর্যালোচনা করেন। একই সঙ্গে ভিসা আবেদনকারী যাচাইয়ের দায়িত্ব রয়েছে-এমন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অন্যান্য সংস্থাও DS-160-এর তথ্য যাচাই করতে পারে।
সামাজিকমাধ্যমে মূলত কী দেখা হতে পারে
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। মার্কিন সরকার সামাজিকমাধ্যমে কী কী পোস্ট করলে নিশ্চিতভাবে ভিসা বাতিল হবে-এমন কোনো সাধারণ ‘নিষিদ্ধ পোস্টের তালিকা’ প্রকাশ করে না। তবে ভিসার যোগ্যতা নির্ধারণে প্রযোজ্য মার্কিন আইন এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের ভিত্তিতে অনলাইনে পাওয়া তথ্য বিবেচনায় আসতে পারে।
বিশেষ করে যেসব তথ্য দেখা হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে-
১. পরিচয়
আবেদনকারীর কাগজপত্রে যে নাম দেওয়া হয়েছে অনলাইনের নামের তথ্য সেই নামের সঙ্গে মিল থাকা জরুরি। অনেক সময় সামাজিকমাধ্যমে উপনাম বা ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে আবেদনের তথ্যের সঙ্গে অনলাইনে পাওয়া তথ্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ দেখাতে পারে।
২. চাকরি ও পেশা
DS-160-এ একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির তথ্য দিলেন, কিন্তু ফেসবুক বা লিংকডইনে একই সময় অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে-এমন অসামঞ্জস্য দেখা গেলে ভিসা রিজেক্ট হতে পারে।
৩. শিক্ষা
আবেদনপত্রে দেওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডিগ্রি বা সময়কালের সঙ্গে প্রকাশ্য অনলাইন তথ্যের বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে। আবার কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ভিসা প্রত্যাখ্যান হতে পারে।
৪. ভ্রমণের উদ্দেশ্য
আবেদনকারী যে ভিসার জন্য আবেদন করছেন, তার প্রকাশ্য অনলাইন বক্তব্য সেই ভিসার ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে গুরুতরভাবে সাংঘর্ষিক কি না সেটি যাচাই করা হতে পারে। যেমন কেউ যদি কোনো আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যেতে চায় কিন্তু সে ফেসবুকে পোস্ট করে যে, সে তার আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছে তাহলে তার ভিসা প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।
৫. জাতীয় নিরাপত্তা
সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা বা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকিসংক্রান্ত তথ্য থাকলে তা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পেতে পারে। এক্ষেত্রে আপনার পোস্ট বিশ্লেষণ করে আপনার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের যাওয়ার পর আপনার সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা বা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকিসংক্রান্ত কোনো ঘটনা ঘটার ঝুঁকি থাকলে আপনার ভিসা প্রত্যাখ্যান হতে পারে।
৬. রাজনৈতিক পোস্ট করলেই কি ভিসা বাতিল?
এই বিষয়ে সামাজিকমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। অনেক জায়গায় দাবি করা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সমালোচনা করলে ভিসা পাওয়া যাবে না’, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে মিম শেয়ার করলে ভিসা বাতিল হতে পারে’ কিংবা ‘আমেরিকাবিরোধী রাজনৈতিক মতপ্রকাশ করা যাবে না’। কিন্তু মার্কিন সরকারের প্রকাশিত তথ্য এত সরল কোনো নিয়মের কথা বলে না।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন আইনজীবীদের সংগঠন American Immigration Lawyers Association-এর সঙ্গে আলোচনার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত নথিতে রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছিল, কনস্যুলার কর্মকর্তারা কোনো বক্তব্যকে আলাদাভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য (political speech) হিসেবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন না। বরং ভিসার আইনগত যোগ্যতার মানদণ্ডের ভিত্তিতে তথ্য যাচাই করা হয়।
এখানে মনে রাখা দরকার, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করা আর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়। শুধু রাজনৈতিক মতামত বা সমালোচনাকে স্বয়ংক্রিয় ভিসা প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। তবে কোনো রাজনৈতিক পোস্ট যদি সন্ত্রাসবাদে সমর্থন, সহিংসতার আহ্বান বা আইন অনুযায়ী ভিসার অযোগ্যতার অন্য কোনো বিষয়ের প্রমাণ হিসেবে প্রাসঙ্গিক হয়, তখন সেটি ভিন্ন বিষয়।
৭. সহিংসতা ও উগ্রবাদ নিয়ে সতর্কতা
সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ বা সহিংস কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনলাইন তথ্য নিরাপত্তা যাচাইয়ে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জারি হওয়া নির্বাহী আদেশ ১৪১৬১-তেও বিদেশি নাগরিকদের সর্বোচ্চ মাত্রায় যাচাই ও স্ক্রিনিংয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আদেশটিতে সন্ত্রাসী হামলা, জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি এবং নির্ধারিত বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থন বা সহায়তার মতো বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
৮. ‘আমেরিকায় গিয়ে স্থায়ী হব’—এমন পোস্ট দিলে কী হবে?
এ ক্ষেত্রেও ভিসার ধরন গুরুত্বপূর্ণ। সব মার্কিন ভিসার ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার ইচ্ছা সমস্যা-এ কথা ঠিক নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী অভিবাসনের জন্যই ইমিগ্রেশন ভিসা রয়েছে। আবার কিছু নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত ভিন্ন। তাই ‘আমেরিকায় স্থায়ী হওয়ার কথা লিখলেই ভিসা বাতিল’—এমন সর্বজনীন দাবি সঠিক নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আবেদনকারী যে ভিসার জন্য আবেদন করছেন, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সেই ভিসার আইনগত শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
৯.পার্টি বা অ্যালকোহলের ছবি থাকলেই ভিসা বাতিল?
এটিও প্রচলিত একটি অতিরঞ্জিত দাবি। মার্কিন সরকারের পাওয়া নথিতে এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই যে ফেসবুকে পার্টি, বৈধ অ্যালকোহল গ্রহণ কিংবা ধূমপানের ছবি থাকলেই আবেদনকারী ভিসা পাবেন না। তবে কোনো প্রকাশ্য কনটেন্ট যদি মাদকসংক্রান্ত অপরাধ বা ভিসার অযোগ্যতার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অন্য কোনো তথ্য প্রকাশ করে, তখন সেটির গুরুত্ব ভিন্ন হতে পারে।
১০.অশ্লীল পোস্ট দেখেই কি ‘ব্যক্তিত্ব পরীক্ষা’ করা হয়?
আপনার ফেসবুকে অশ্লীল ছবি বা রাগের পোস্ট দেখে কনস্যুলার কর্মকর্তা আপনার ‘ব্যক্তিত্বের নম্বর’ দেবেন—এমন কোনো সরকারি নিয়ম পাওয়া যায়নি। ভিসা কর্মকর্তার মূল দায়িত্ব হচ্ছে মার্কিন অভিবাসন আইন অনুযায়ী আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট ভিসার জন্য যোগ্য কি না তা নির্ধারণ করা।
সুতরাং সামাজিকমাধ্যম যাচাইকে সাধারণ ‘চরিত্র পরীক্ষা’ হিসেবে উপস্থাপন না করে পরিচয়, যোগ্যতা, নিরাপত্তা ও প্রযোজ্য আইনি মানদণ্ডের অংশ হিসেবে দেখা বেশি সঠিক।
পুরোনো পোস্ট মুছলে কি সন্দেহ বাড়বে?
এ নিয়েও প্রচলিত বক্তব্যের সঙ্গে সরকারি নিয়মের পার্থক্য রয়েছে। ‘ভিসার আগে কোনো পোস্ট ডিলিট করলে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সন্দেহ বেড়ে যাবে’—এমন নিয়ম সরকারি নির্দেশনায় পাওয়া যায়নি। তবে আবেদনপত্রে চাওয়া তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া আলাদা বিষয়। তাই ভিসার জন্য আবেদন করার আগে নিজের সামাজিকমাধ্যম থেকে সব রাজনৈতিক পোস্ট, পুরোনো ছবি বা মতামত আতঙ্কিত হয়ে মুছে ফেলার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে DS-160-এ সঠিক তথ্য দেওয়া।
এআই দিয়ে কি সব পোস্ট স্ক্যান করা হয়?
বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, ডেটাবেস ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা যাচাইয়ের কথা বলা হলেও, প্রত্যেক ভিসা আবেদনকারীর প্রতিটি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা এক্স পোস্ট নির্দিষ্ট কোনো এআই সফটওয়্যার দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ক্যান করা হয়-এমন বিস্তারিত প্রক্রিয়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশ্য ভিসা নির্দেশনায় নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
সরকারি সূত্রে নিশ্চিত বিষয় হচ্ছে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ভিসা স্ক্রিনিং ও যাচাইয়ে সব তথ্য ব্যবহারের কথা বলছে এবং নির্দিষ্ট ভিসা শ্রেণির ক্ষেত্রে অনলাইন প্রেজেন্স রিভিউ করছে। এক্ষেত্রে তারা সফটওয়্যার ব্যবহার করছে কিনা বা করছে কী ধরনের তা সাধারণত প্রকাশ করা হয় না।
কবে থেকে সামাজিকমাধ্যম যাচাই শুরু হয়েছে?
২০১৯ সালের ৩১ মে থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অধিকাংশ অভিবাসী ও অ-অভিবাসী ভিসা আবেদনকারীর কাছ থেকে নির্দিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত পরিচয় বা ‘সোশ্যাল মিডিয়া আইডেন্টিফায়ার’ সংগ্রহ শুরু করে।
এরপর ধাপে ধাপে অনলাইন উপস্থিতি যাচাইয়ের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে H-1B ও H-4 আবেদনকারীদের বর্ধিত অনলাইন উপস্থিতি যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়। আর ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে আরও বেশ কয়েকটি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা শ্রেণির আবেদনকারীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের বর্ধিত অনলাইন যাচাই কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
২০১৯ সালে শুরু, পেছনে ২০১৭ সালের সিদ্ধান্ত
২০১৭ সালের ৬ মার্চ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভিসা ও অন্যান্য অভিবাসন সুবিধার আবেদনের ক্ষেত্রে বর্ধিত স্ক্রিনিং ও যাচাই বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল মেমোরেন্ডাম দেন। একই সময়ের নির্বাহী আদেশ ১৩৭৮০-এর ৫ নম্বর ধারায় ভিসা আবেদনের জন্য অভিন্ন স্ক্রিনিং ও যাচাইয়ের মানদণ্ড বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। এর ধারাবাহিকতায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ভিসা আবেদনপত্রে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়।
২০১৯ সালের ৩১ মে DS-160, DS-260-সহ সংশ্লিষ্ট ভিসা আবেদনপত্রে পরিবর্তন কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে বিশ্বের অধিকাংশ মার্কিন ভিসা আবেদনকারীর কাছ থেকে সামাজিকমাধ্যমের পরিচয় সংগ্রহ শুরু হয়। অর্থাৎ ভিসা আবেদনে সামাজিকমাধ্যম যাচাই ২০২৬ সালের নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়। বরং সাত বছরের বেশি সময় ধরে চলা একটি ব্যবস্থাকে এখন নির্দিষ্ট ভিসা শ্রেণির ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃতভাবে অনলাইন উপস্থিতি পর্যালোচনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
২০২৫ সালে H-1B ও H-4-এ বাড়ে নজরদারি
সামাজিকমাধ্যমের পরিচয় সংগ্রহের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট শ্রেণির আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ‘অনলাইন উপস্থিতি পর্যালোচনা’ বা online presence review আরও বিস্তৃত করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর জানায়, ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর থেকে H-1B ভিসা আবেদনকারী এবং তাদের H-4 নির্ভরশীলদের ক্ষেত্রেও অনলাইন উপস্থিতি পর্যালোচনা সম্প্রসারিত হবে। এর আগে F, M ও J শ্রেণির শিক্ষার্থী ও এক্সচেঞ্জ ভিজিটর আবেদনকারীরা এ ধরনের বর্ধিত পর্যালোচনার আওতায় ছিলেন।
৩০ মার্চ ২০২৬ থেকে আরও বড় পরিসরে
২০২৬ সালে এই ব্যবস্থার পরিধি আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ২৫ মার্চ জানায়, ৩০ মার্চ ২০২৬ থেকে আরও কয়েকটি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা শ্রেণির আবেদনকারীর অনলাইন উপস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে।
নতুন করে অন্তর্ভুক্ত ভিসা শ্রেণিগুলো হলো; A-3, C-3—গৃহকর্মীর ক্ষেত্রে, G-5, H-3, H-3 ভিসাধারীর H-4 নির্ভরশীল, K-1, K-2, K-3, Q, R-1, R-2, S, T ও U। এর সঙ্গে আগে থেকেই বর্ধিত অনলাইন উপস্থিতি যাচাইয়ের আওতায় থাকা H-1B ও সংশ্লিষ্ট H-4 এবং F, M ও J ভিসার আবেদনকারীরাও থাকছেন।
প্রোফাইল ‘পাবলিক’ বা ‘ওপেন’ রাখতে নির্দেশ
২০২৬ সালের ঘোষণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে সামাজিকমাধ্যম অ্যাকাউন্টের প্রাইভেসি সেটিংস। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর স্পষ্টভাবে বলেছে, বর্ধিত অনলাইন যাচাইয়ের আওতায় থাকা সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের তাদের সব সামাজিকমাধ্যম প্রোফাইলের প্রাইভেসি সেটিংস পাবলিক বা ওপেন করতে হবে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, এতে আবেদনকারীর অনলাইন উপস্থিতি যাচাই সহজ হবে।
ফলে ‘মার্কিন ভিসা কর্তৃপক্ষ কখনও সামাজিকমাধ্যম প্রোফাইল পাবলিক করতে বলে না’—এমন ধারণা এখন অন্তত এসব নির্দিষ্ট ভিসা শ্রেণির ক্ষেত্রে সঠিক নয়।
সামাজিকমাধ্যম কেন এত গুরুত্ব
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিসা স্ক্রিনিং ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তাদের কাছে উপলব্ধ সব ধরনের তথ্য ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য অযোগ্য ব্যক্তি এবং দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা বা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারেন-এমন আবেদনকারীদের শনাক্ত করার জন্যই এ যাচাই করা হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলেছে, প্রতিটি ভিসার সিদ্ধান্তই তাদের কাছে একটি ‘জাতীয় নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদনকারী আমেরিকান নাগরিক বা মার্কিন জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করার উদ্দেশ্য রাখেন কি না, সে বিষয়ে ভিসা দেওয়ার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’
ভিসা অধিকার নয়, বিশেষ সুযোগ
২০২৬ সালের ঘোষণায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আরও একটি বার্তা দিয়েছে- “A U.S. visa is a privilege, not a right.” অর্থাৎ মার্কিন ভিসাকে কোনো ব্যক্তির অধিকার হিসেবে দেখে না যুক্তরাষ্ট্র; নির্ধারিত যোগ্যতা ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের পর এটি দেওয়া হয়।
ফেসবুকের তথ্য আর DS-160 আলাদা হলে কী হবে?
ভিসা আবেদনকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে তথ্যের সত্যতা ও সামঞ্জস্য। ধরা যাক, একজন আবেদনকারী DS-160-এ বলেছেন তিনি একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। কিন্তু তার লিংডইন প্রোফাইলে অন্য তথ্য রয়েছে। এতে ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে-এমন নয়। কারণ সামাজিকমাধ্যমের তথ্য পুরোনোও হতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্য থাকলে কর্মকর্তা আবেদনকারীর কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারেন।
একইভাবে বৈবাহিক অবস্থা, চাকরি, শিক্ষা, পরিচয় বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য দিলে বিষয়টি গুরুতর হতে পারে। DS-160-এর সরকারি নির্দেশনাতেও আবেদনকারীকে সব প্রশ্ন সঠিক ও পূর্ণাঙ্গভাবে উত্তর দিতে বলা হয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের ব্যক্তিগত চ্যাট কি দেখা হয়?
DS-160-এ সামাজিকমাধ্যমের পরিচয় চাওয়া আর আবেদনকারীর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার কথোপকথন নিয়মিতভাবে পড়া-দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। মার্কিন সরকারের প্রকাশিত সামাজিকমাধ্যম সংগ্রহের নিয়মে মূলত সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলের কথা বলা হয়েছে। ফলে ‘ভিসা আবেদন করলেই কনস্যুলার কর্মকর্তা আপনার হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের ব্যক্তিগত কথোপকথন পড়ে ফেলবেন’—এমন দাবি সরকারি নথি দিয়ে সমর্থিত নয়।
আবেদনকারীর কী করা উচিত
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার জন্য আবেদন করতে চাইলে সামাজিকমাধ্যম নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে কয়েকটি সাধারণ নীতি অনুসরণ করাই সবচেয়ে কার্যকর।
১. DS-160 সঠিকভাবে পূরণ করুন: যে তথ্য চাওয়া হয়েছে, তার সত্য ও পূর্ণাঙ্গ উত্তর দিন।
২. পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিকমাধ্যম মনে করুন: ফর্মে যে প্ল্যাটফর্মগুলোর তথ্য চাওয়া হবে, সেখানে ব্যবহৃত হ্যান্ডেল সঠিকভাবে উল্লেখ করুন।
৩. চাকরি ও শিক্ষার তথ্য মিলিয়ে দেখুন: DS-160-এ দেওয়া তথ্য এবং লিংকডিন বা অন্যান্য প্রকাশ্য প্রোফাইলে থাকা বাস্তব তথ্যের মধ্যে বড় কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করুন।
৪. মিথ্যা পরিচয় তৈরি করবেন না: ভিসার জন্য আলাদা ‘পরিষ্কার’ অনলাইন পরিচয় বানিয়ে প্রকৃত তথ্য গোপন করার চেষ্টা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
৫. ভিসার ধরন বুঝুন: আপনার অনলাইন বক্তব্যে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্র সফরের উদ্দেশ্য এবং আবেদন করা ভিসার উদ্দেশ্যের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ আছে কি না খেয়াল করুন।
৬. নিরাপত্তাসংক্রান্ত কনটেন্টে সতর্ক থাকুন: সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সমর্থনসূচক বিষয় ভিসা যাচাইয়ে গুরুতর হতে পারে।
৭. বর্ধিত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকলে প্রোফাইল পাবলিক করুন: H-1B, সংশ্লিষ্ট H-4, F, M, J এবং ৩০ মার্চ ২০২৬ থেকে ঘোষিত অতিরিক্ত ভিসা শ্রেণির আবেদনকারীদের জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ privacy-setting নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
সূত্র: উল্লিখিত তথ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ভিসা ও কনস্যুলারবিষয়ক সরকারি নির্দেশনা, Travel.State.Gov এবং U.S. Federal Register-এ প্রকাশিত ভিসা আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংক্রান্ত নীতিমালার আলোকে লেখা হয়েছে।




