কাশ্মীরে মসজিদে খুতবায় বিজেপির হস্তক্ষেপ, ক্ষোভে ফুঁসছেন মুসলিমরা

ভারতজুড়ে মসজিদের মাইকে আজান দেওয়া বন্ধ নিয়ে সমালোচনার মুখে নতুন করে বিতর্কে জড়াল ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। এবার ভারতশাসিত কাশ্মীরের মসজিগুলোতে জুমার খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতে দলটি। এ জন্য অভিন্ন নির্দেশনা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কট্টর হিন্দুত্ববাদী দলটির এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন রাজনৈতিক নেতা ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো। তারা বলছেন, পবিত্র জুমার খুতবার বিষয় নির্ধারণের দায়িত্ব ইসলামি পণ্ডিতদের, প্রশাসনের নয়। এই ধরনের পদক্ষেপ মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, ভারতশাসিত কাশ্মীরের মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জুমার খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণে অভিন্ন নির্দেশনা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর ওয়াক্ফ বোর্ডের এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও। তাদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এ উদ্যোগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মিরওয়াইজ উমর ফারুকের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের জোট মুত্তাহিদা মজলিস-ই-উলামা (এমএমইউ)। সংগঠনটি বলেছে, ‘খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের দায়িত্ব ইসলামি পণ্ডিতদের, কোনো প্রশাসনিক সংস্থার নয়।’
সংবাদমাধ্যম বলছে, কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এ প্রস্তাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির বিরুদ্ধে মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন। পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীর ওয়াক্ফ বোর্ডের চেয়ারম্যানকে প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ওমর আবদুল্লাহ বলেন, ‘বিজেপির নিয়োগ দেওয়া চেয়ারম্যানকে অবিলম্বে তার রাজনৈতিক প্রভুদের খুশি করার এই ভুল উদ্যোগ বাতিল করতে হবে।’
অন্যদিকে পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (পিডিপি) সভাপতি মেহবুবা মুফতিও এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। ইমামরা কী বিষয়ে বক্তব্য দেবেন, তা কে নির্ধারণ করবে—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি। মুফতি বলেন, ‘আমাদের ইমাম ও মাওলানারা জানেন, কী বলতে হবে এবং কখন বলতে হবে’।
জম্মু-কাশ্মীর সরকারকে ওয়াক্ফ বোর্ডের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
কাশ্মীরের সংসদ সদস্য আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ মেহদি বলেন, ‘ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করলে মিম্বর তার মূল তাৎপর্য ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা হারায়। মিম্বর কখনো ক্ষমতার কাছে মাথা নত করে না, ভবিষ্যতেও তা হওয়া উচিত নয়।’ তিনি আরও বলেন, ওয়াক্ফ বোর্ডের জুমার খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের পরিকল্পনা ‘সমন্বয়ের’ আড়ালে ধর্মবিশ্বাসের ওপর সরাসরি আঘাত।
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের আগস্টে জম্মু-কাশ্মীরের আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করে ভারত। এরপর থেকে অঞ্চলটির পুলিশ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় সরকার-নিযুক্ত লেফটেন্যান্ট গভর্নরের হাতে রয়েছে। বর্তমানে এ পদে রয়েছেন মনোজ সিনহা। আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আর কর্তৃত্ব নেই। একইভাবে জম্মু-কাশ্মীর ওয়াক্ফ বোর্ডও স্থানীয় নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে ক্ষমতাসীন বিজেপির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মসজিদে মসজিদে নজরদারি
২০২৬ সালের শুরুতে ভারতীয় পুলিশ কাশ্মীরের সব মসজিদ, সেগুলোর ইমাম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও তথ্য সংগ্রহের জন্য বিতর্কিত নজরদারি অভিযান চালায়। মসজিদগুলোর তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় কাশ্মীরের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয় পুলিশ।
কাশ্মীর উপত্যকার জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশের বেশি মুসলমান। ২০১৯ সালের আগস্টে আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিলের পর অঞ্চলটিতে দীর্ঘ সময় ধরে যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ রাখা, ব্যাপক ও নির্বিচার ধরপাকড় এবং প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুও এই কাশ্মীর। দুই দেশই পুরো অঞ্চলটির মালিকানা দাবি করে, তবে উভয় দেশই পৃথক অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
ভারতশাসিত কাশ্মীরে ১৯৮৯ সালে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়। উপত্যকার অনেক মুসলমান স্বাধীনতা অথবা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে।
কাশ্মীরে বর্তমানে সাত লাখের বেশি সেনা মোতায়েন রেখেছে ভারত। দেশটির অভিযোগ, পাকিস্তান সেখানে সশস্ত্র বিদ্রোহে মদদ দিচ্ছে। তবে ইসলামাবাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা কাশ্মীরিদের শুধু রাজনৈতিক, নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দেয়।

