ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার/জেলে যেতে হলেও ডিসেম্বরেই দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা

চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা পুনর্ব্যক্ত করেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে কারাদণ্ডসহ যে কোনো আইনি পরিণতি ভোগ করতে প্রস্তুতির কোথাও জানিয়েছেন। তবে কীভাবে তিনি দেশে ফিরবেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে ফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা জানিয়েছেন।
সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের আদেশকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে দেশে ফিরে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে নিজের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বিচার ও ‘আইনি রক্ষাকবচ’ দাবি করেছেন তিনি।
সংবাদমাধ্যমটিকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আমার মাতৃভূমিতে ফেরার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছি। আমি বিশ্বাস করি, দেশে ফেরার অধিকার আমার রয়েছে এবং বাংলাদেশের কোনো আইনই আমাকে তা করতে বাধা দিতে পারে না।’
কীভাবে দেশে ফিরবেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনও চূড়ান্ত হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ আমি খোলাখুলি ও দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছি, আমি আমার মাতৃভূমি ও জনগণের কাছে ফিরতে চাই। প্রশ্নটা আমি ফিরব কি না, তা নয়; বরং কীভাবে এমনভাবে ফেরা যায়, যাতে আমাদের জাতি ও দেশের নাগরিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।’
‘চলমান আলোচনা ও নানা জল্পনা-কল্পনার’ কথা উল্লেখ করলেও দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ বা ভারত সরকারের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক বা নেপথ্য যোগাযোগের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি শেখ হাসিনা।
২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সে প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে এবং বাংলাদেশের জনগণের সেবা করতে যদি এটাই মূল্য হিসেবে দিতে হয়, তাহলে আমি কারাদণ্ডসহ যে কোনো আইনি পরিণতি ভোগ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।’
তবে মৃত্যুদণ্ডের পেছনের আইনি প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করেছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। তিনি ওই রায়কে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অন্যায্য’ বলে আখ্যা দেন। তার মতে, তার দেশত্যাগের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ‘অসাংবিধানিক’ এবং ‘প্রতিশোধমূলক উদ্দেশ্য’ নিয়ে কাজ করেছে। এই বিচার ও রায়কে তিনি ‘একটি প্রহসন’ বলেও প্রত্যাখ্যান করেন।
শেখ হাসিনা আশা করেন যে, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা তার মামলায় ন্যায্যভাবে আইন প্রয়োগ করবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিচারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সারা জীবন আমি আইন ও ন্যায়বিচারের নীতিকে দৃঢ়ভাবে সমুন্নত রেখেছি। আমি আমার নিজের ক্ষেত্রেও আইনের একই রকম ন্যায্য প্রয়োগ প্রত্যাশা করি।’
যে কোনো বিচারিক কার্যক্রমে নিজের অধিকারের ‘পূর্ণ আইনি সুরক্ষা’ও দাবি করেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন হাসিনা। এনডিটিভিকে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগই সেই দল, যা বাংলাদেশকে স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দিয়েছে এবং আমাদের জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার রক্ষক হিসেবে কাজ করে আসছে।’
দলের সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন এবং সারা দেশে সমর্থকদের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপনে তিনি ইতোমধ্যে কাজ করছেন বলেও জানান। তিনি বলেন, ‘এই পুনরুজ্জীবনে আমি নিজেকে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকায় দেখি। আমাদের লক্ষ্য হলো গণতান্ত্রিক শাসন পুনরুদ্ধার করা এবং সব বাংলাদেশির অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা।’
চরমপন্থা নিয়ে সতর্কতা
বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে সৃষ্ট ‘গুরুতর’ হুমকি নিয়ে সতর্ক করেছেন হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোর সৃষ্ট হুমকি গুরুতর এবং একে কখনোই অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।’
তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের শাসনামলে জাতীয় নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার ছিল বলে এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন শেখ হাসিনা। উগ্রবাদ মোকাবিলায় শক্তিশালী গোয়েন্দা সক্ষমতা, কার্যকর আইন প্রয়োগ ও জনসম্পৃক্ততার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে নাগরিক স্বাধীনতার ভারসাম্য রক্ষার কথাও বলেন।
চরমপন্থি হুমকিকে বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘চরমপন্থি নেটওয়ার্ক ও মতাদর্শ কোনো একক দেশে সীমাবদ্ধ থাকে না; এগুলো সীমানা অতিক্রম করে। সুতরাং, বাংলাদেশকে তার দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করা বাস্তবসম্মত বা ফলপ্রসূ কোনোটিই নয়।’
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামনে একদিকে রয়েছে বৃহত্তর দমনপীড়ন ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অন্যদিকে গভীরতর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণ। তিনি বলেন, ‘কৌশলগত পছন্দটি স্পষ্ট। নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি পরস্পরকে শক্তিশালী করে।’


