logo

হরমুজে নতুন নৌরুট ও আরেকটি নিষিদ্ধ অঞ্চলের ঘোষণা ইরানের

রয়টার্স
রয়টার্স
হরমুজে নতুন নৌরুট ও আরেকটি নিষিদ্ধ অঞ্চলের ঘোষণা ইরানের
ওমানের মুসান্দাম থেকে তোলা হরমুজ প্রণালির নৌযানসমূহ, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

পারস্য উপসাগরে নতুন একটি নিষিদ্ধ অঞ্চল ঘোষণা এবং হরমুজ প্রণালিতে নতুন আন্তর্জাতিক নৌপথের মানচিত্র প্রকাশের পরিকল্পনা করছে ইরান। সপ্তাহান্তে জাহাজ চলাচল ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলার পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার মধ্যেই তেহরান এ ঘোষণা দিল।

রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চলের ঘোষণা দেওয়া হবে।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ইরান অবরোধ যেখানে শুরু হয়েছে, সেখান থেকে ওই নিষিদ্ধ অঞ্চল শুরু হয়ে উপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হবে। নতুন অঞ্চলে প্রবেশকারী যেকোনো জাহাজকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা হবে।

হরমুজ প্রণালির জন্য নতুন নৌপথের মানচিত্রও শিগগির অনুমোদন করা হবে বলে জানান রেজায়ি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়া ওই আন্তর্জাতিক করিডরের ব্যবস্থাপনা ইরানের হাতে থাকবে।

রেজায়ি বলেন, “আমেরিকানরা ইরানের বিরুদ্ধে নাশকতা, হুমকি ও হামলা বন্ধ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার প্রতিশ্রুতি আমরা দেব না।”

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমেছে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই জলপথ দিয়ে সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো।

সোমবারের শিপিং তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা মে মাসের পর সর্বনিম্ন।

জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। এরই মধ্যে গত সপ্তাহের বড় ধরনের বৃদ্ধির পর সোমবারও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আরও ০.৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলারের ওপরে উঠেছে।

পাল্টাপাল্টি হামলায় নতুন করে উত্তেজনা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পরও সংঘাত অনেকটা অচলাবস্থায় রয়েছে। জুনে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির একটি সমঝোতা হলেও তা ভেঙে পড়েছে। শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

আগস্টের বড় একটি সময় সামরিক তৎপরতায় বিরতি থাকলেও সম্প্রতি আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শনিবার মার্কিন বাহিনী তিনটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। এর একটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে ছিল। এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ওই অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালিয়েছিল বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

নিষেধাজ্ঞায় চাপে ইরানের অর্থনীতি

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও তেল রপ্তানি অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি ক্রমেই চাপে পড়ছে। দেশটির কর্মকর্তারা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সংস্কারের কথা বললেও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন হবে—এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকার কালিবাফ রোববার বলেন, “অনেক দেরি হওয়ার আগেই” যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে পরিস্থিতির নিয়ম বদলে গেছে।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখন থেকে ইরানের স্বার্থ ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনো হামলার জবাব আরও দ্রুত, কঠোর ও বেদনাদায়ক হবে।

কালিবাফ বলেন, সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি ইরানের প্রধান লড়াই এখন উৎপাদন ও জনগণের জীবনযাত্রা নিয়ে। মুদ্রার মূল্য ওঠানামা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও বাজার ব্যবস্থাপনাকে তিনি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।

খার্গ দ্বীপে শত শত হামলার দাবি

ইরান ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক। যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ খার্গ দ্বীপের রপ্তানি কেন্দ্র দিয়ে রপ্তানি হতো। এপ্রিলের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানিতে অবরোধ শুরু করার পর এসব সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, রোববার পর্যন্ত অবরোধ কার্যকর করতে তারা ৯২টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে, তিনটি অচল করেছে এবং দুটি জাহাজে তল্লাশি চালিয়েছে।

ইরানের তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, গত কয়েক মাসে খার্গ দ্বীপে প্রায় ৫৫০ বার হামলা হয়েছে। তবে এত হামলার পরও দ্বীপটির কার্যক্রম চালু রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখনো তেল পরিবহন হচ্ছে। তাঁর মতে, বিকল্প পাইপলাইনসহ বর্তমানে প্রতিদিন ৯০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল প্রণালিটি দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে, যা সংঘাত শুরুর আগের প্রবাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি।