logo

এক নারীকে ধরতে ৮৩ হাজারের বেশি ক্যামেরায় অনুসন্ধান

বিবিসি
এক নারীকে ধরতে ৮৩ হাজারের বেশি ক্যামেরায় অনুসন্ধান
নজরদারির জন্য ক্যামেরার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ছবি: বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে মানুষের চলাফেরা ও কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির জন্য ক্যামেরার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। নিউইয়র্ক শহরেও রাস্তাঘাট, ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে বিপুলসংখ্যক ক্যামেরা রয়েছে। এসব ক্যামেরার অনেকগুলোর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যভান্ডারের সংযোগ থাকায় সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

Advertisement

বিবিসির সাংবাদিক থমাস জারমেইন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘সার্ভেইল্যান্স টেকনোলজি ওভারসাইট প্রজেক্ট’-এর নির্বাহী পরিচালক মিশেল ডালের সঙ্গে এ বিষয়ে ঘুরে দেখেন। তাদের আলোচনায় উঠে আসে, শহরটির নজরদারি ব্যবস্থা কতটা বিস্তৃত এবং সাধারণ মানুষ কতটা সহজেই এর আওতায় চলে আসতে পারেন।

নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) ‘ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস সিস্টেম’ নামে একটি বড় নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে। এতে ৮০ হাজারের বেশি ক্যামেরা যুক্ত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ক্যামেরার সঙ্গে ড্রোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গাড়ির চলাচল শনাক্ত করার প্রযুক্তিও যুক্ত রয়েছে। মিশেল ডালের দাবি, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পুলিশ কোনো ব্যক্তির চলাফেরা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্যের একটি বিস্তারিত চিত্র পেতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে নজরদারি ব্যবস্থার বিস্তার শুধু এনওয়াইপিডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্যামেরা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ক্যামেরা এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির তৈরি নজরদারি ব্যবস্থা মিলিয়ে দেশজুড়ে একটি বড় পরিসরের নজরদারি অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউইয়র্ক শহরে ‘ফ্লক সেফটি’ নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানের ক্যামেরা কার্যক্রম না থাকলেও সেখানে নজরদারি ক্যামেরার অভাব নেই। সাংবাদিক থমাস জারমেইন মিশেল ডালের সঙ্গে নিউইয়র্কের একটি এলাকায় হাঁটার সময় অল্প কয়েক পা এগিয়েই ১৬টি ক্যামেরা দেখতে পান।

এর মধ্যে অনেক ক্যামেরা বিভিন্ন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ। তবে এসব ক্যামেরার ধারণ করা ভিডিওতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশাধিকার থাকতে পারে। অ্যামাজনের ‘রিং’ ক্যামেরার ক্ষেত্রেও পুলিশের কাছে ভিডিও চাওয়ার জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ফ্লক সেফটি। প্রতিষ্ঠানটির ক্যামেরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬ হাজার এলাকায় ১ লাখের বেশি ক্যামেরার একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। এসব ক্যামেরা মাসে প্রায় ২০ বিলিয়নবার গাড়ির নম্বরপ্লেট স্ক্যান করে। প্রযুক্তিটির মাধ্যমে গাড়ির পাশাপাশি মানুষের গতিবিধি শনাক্ত করার বিভিন্ন সক্ষমতাও রয়েছে।

ফ্লক সেফটির প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি ঘটনা বিশেষভাবে বিতর্ক তৈরি করেছে। টেক্সাসের এক শেরিফের কার্যালয় গর্ভপাত করানো এক নারীকে খুঁজতে ফ্লকের ৮৩ হাজারের বেশি ক্যামেরায় অনুসন্ধান চালিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ফ্লক সেফটির নজরদারি ব্যবস্থা ব্যবহার করেছেন—এমন অন্তত ৪৬টি ঘটনার কথাও সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় কেউ সাবেক সঙ্গী, পরিচিত ব্যক্তি বা অপরিচিত কাউকে অনুসরণ করতে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফ্লক সেফটি এ ধরনের অপব্যবহারকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে বিভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। তবে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টির বেশি শহর ফ্লক সেফটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এর মধ্যে কিছু শহর আবার অন্য নজরদারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়েছে।

ফ্লক সেফটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের প্রযুক্তি অপরাধ সমাধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করে। প্রতিষ্ঠানটি নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে আরও স্পষ্ট নিয়মকানুন তৈরির পক্ষেও মত দিয়েছে।

এনওয়াইপিডিও বলছে, নজরদারি ব্যবস্থা শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিভাগটি এ বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ এসব প্রযুক্তি থেকে পাওয়া তথ্য এবং সেগুলোর কার্যকারিতা পরিমাপের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষও তাদের আশপাশে থাকা নজরদারি ক্যামেরার অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন। ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের (ইএফএফ) ‘অ্যাটলাস অব সার্ভেইল্যান্স’ নামে একটি ইন্টার‌্যাকটিভ মানচিত্রে বিভিন্ন নজরদারি প্রযুক্তির অবস্থান দেখানো হয়। তবে এই মানচিত্র সম্পূর্ণ নয়।

আরেকটি উদ্যোগ ‘ডিফ্লক’ সাধারণ মানুষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন নজরদারি ক্যামেরার অবস্থান চিহ্নিত করে। সেখানে হাজার হাজার ক্যামেরার তথ্য রয়েছে। তবে যে কেউ তথ্য যোগ করতে পারায় এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদক নিজেও হাঁটার দূরত্বের মধ্যে চারটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ক্যামেরা দেখতে পান।

ইএফএফের রিনডালা আলাজাজির মতে, নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই যে মানুষের নিরাপত্তা বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এর মাধ্যমে এমন মানুষও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে চলে আসতে পারেন, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ নেই।

তিনি এমন ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করার প্রযুক্তির ভুল তথ্যের কারণে নিরপরাধ মানুষকে গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, অস্ত্রের মুখে আটক বা এমনকি কারাগারে পাঠানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

যুক্তরাজ্যেও মুখ শনাক্ত করার প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। সমালোচকেরা বলছেন, এর মাধ্যমে দেশটি ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত নজরদারি ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।

ম্যানহাটনে মিশেল ডালের সঙ্গে হাঁটার সময় সাংবাদিক থমাস জারমেইন একের পর এক নজরদারি ক্যামেরা দেখতে পান। পাতাল রেল থেকে শুরু করে সড়ক—শহরের প্রায় সর্বত্রই ক্যামেরার উপস্থিতি চোখে পড়ে।