logo

সাংবাদিকদের ‘নিরপেক্ষ নয়, সত্যনিষ্ট হওয়ার’ পরামর্শ আমানপুরের

জেরুজালেম পোস্ট
জেরুজালেম পোস্ট
সাংবাদিকদের ‘নিরপেক্ষ নয়, সত্যনিষ্ট হওয়ার’ পরামর্শ আমানপুরের
সিএনএনের প্রধান আন্তর্জাতিক অ্যাঙ্কর ও জ্যেষ্ঠ যুদ্ধ সংবাদদাতা ক্রিশ্চিয়ান আমানপুর। ছবি: সিএনএন

দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় যুক্ত থাকার পর ‍মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আন্তর্জাতিক অ্যাঙ্কর ও জ্যেষ্ঠ যুদ্ধ সংবাদদাতা ক্রিশ্চিয়ান আমানপুর। ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী বছরের জুনে চাকরি ছাড়বেন তিনি। দীর্ঘ ৪৩ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অজ্ঞিতার আলোকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘সত্যনিষ্ট হতে হবে, নিরপেক্ষ নয়’।

গত ১৯ অক্টোবর এক বিবৃতিতে সিএনএন ছাড়ার ঘোষণা দেন আমানপুর। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘অনেক মাস ধরে চিন্তাভাবনা এবং কয়েকটি নির্ঘুম রাত কাটানোর পর আমি সিএনএন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রতিষ্ঠানটি ছিল আমার ৪৩টি অসাধারণ বছরের সঙ্গী।’

তবে সিএনএন ছাড়ার সিদ্ধান্তকে অবসর হিসেবে দেখছেন না আমানপুর। বরং নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘সামনে আকর্ষণীয় কিছু নতুন প্রকল্প নিয়ে কাজ করার অপেক্ষায় আছি। তবে সিএনএনের প্রতি সবসময় আমার সমর্থন থাকবে। প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীন সাংবাদিকতার ঐতিহ্যও আমি সমুন্নত রাখতে চাই। মনে রাখবেন, সবসময় সত্যনিষ্ঠ হতে হবে, নিরপেক্ষ নয়।’

সিএনএনে নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের কথা স্মরণ করে আমানপুর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত ও যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করার স্মৃতিও উল্লেখ করেন তিনি।

আমানপোর বলেন, ‘প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহের রোমাঞ্চকর দায়িত্ব থেকে শুরু করে বসনিয়া যুদ্ধের ভয়াবহতা, রুয়ান্ডা, আফগানিস্তান, ইউক্রেন ও ইরানসহ বিভিন্ন সংঘাতের সংবাদ সংগ্রহ করেছি। এর মধ্যবর্তী সময়ে আরও অনেক ঘটনা কাভার করেছি। তবে এসব কাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমাদের দল ও সহকর্মীদের পারস্পরিক বন্ধন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে সত্য, প্রমাণ ও মানবিকতার সন্ধানে কাজ করেছি, যাতে সিএনএন নির্ভয়ে ও পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থেকে বিশ্বের সত্য তুলে ধরতে পারে এবং বিশ্ববাসীর কাছে তা পৌঁছে দিতে পারে।’

২০০৯ সাল থেকে সিএনএন ইন্টারন্যাশনালে নিজের নামে প্রচারিত রাতের সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে আসছেন আমানপুর।

সিএনএন ছাড়লেও পডকাস্ট অনুষ্ঠান ‘দ্য এক্স ফাইলস’-এর সহ-উপস্থাপনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনি। গ্লোবাল প্রযোজিত এই পডকাস্টে তার সঙ্গে থাকবেন সাবেক স্বামী জেমি রুবিন।

কে এই আমানপুর

আমানপুরের জন্ম পশ্চিম লন্ডনের ইলিং এলাকায়। তার বাবা মোহাম্মদ তাকি আমানপুর ছিলেন ইরানি ও মা অ্যান প্যাট্রিসিয়া হিল ছিলেন ব্রিটিশ। তার বাবা ছিলেন শিয়া মুসলিম এবং মা রোমান ক্যাথলিক। আমানপুর ১১ বছর বয়স পর্যন্ত তেহরানে বেড়ে ওঠেন। এরপর তাকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি বাকিংহামশায়ারের একটি বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৬ বছর বয়সে তিনি এসেক্সের চেমসফোর্ডের রোমান ক্যাথলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যান।

ইংল্যান্ডে পড়াশোনা শেষ করার পর আমানপুর ইরানে ফিরে আসেন। তার বাবা ‘ইরান এয়ার’-এ নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের সময় তিনি তার চাকরি ও সম্পদ হারান। ১৯৭৯ সালেই তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায়। সেখানে তিনি রোড আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি রোড আইল্যান্ডের প্রভিডেন্সে অবস্থিত ডব্লিউবিআরইউ-এফএমের সংবাদ বিভাগে কাজ করতেন। এ ছাড়া তিনি প্রভিডেন্সেই এনবিসির সহযোগী স্টেশন ডব্লিউজেএআরে ইলেকট্রনিক গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবেও কাজ করেছেন। ১৯৮৩ সালে আমানপুর সাংবাদিকতায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

নিজের প্রজন্মের অন্যতম সম্মানিত সম্প্রচার সাংবাদিক হিসেবে তিনি নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই গণমাধ্যমে এক পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। পরে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন; যার মধ্যে রয়েছে সিবিএসের ‘সিক্সটি মিনিটস’ (১৯৯৬-২০০৫) অনুষ্ঠানে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করা এবং পিবিএসে নিজের অনুষ্ঠান ‘আমানপুর অ্যান্ড কোম্পানি’ (২০১৮-বর্তমান) উপস্থাপনা করা। এ ছাড়া তিনি এবিসির রোববারের সকালের আলোচনা অনুষ্ঠান ‘দিস উইক’র উপস্থাপক হিসেবেও কিছুকাল দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কর ফাঁকির মামলায় নানাভাবে হয়রানির শিকার নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার মেয়ে অপেরা শিল্পী মনিকার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন আমানপুর। এ ছাড়া কক্সবাজার আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপন নিয়েও প্রতিবেদন করেছেন তিনি।