বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগকিরদের জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠিয়েছে রাশিয়া, প্রমাণ পেল জাতিসংঘ

বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তরুণদের উচ্চ বেতনে লোভনীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দিচ্ছে রাশিয়া। টানা চার বছর ধরে ইউক্রেনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোতে সামরিক হামলার কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকটকে আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এসব দেশের নাগরিকদের প্রতারণার মাধ্যমে ও জোরপূর্বক যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ।
প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ইউক্রেনে জ্বালানি অবকাঠামোতে ইচ্ছাকৃত হামলার মাধ্যমে রাশিয়া যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘঠিত করেছে। এর ফলে হাড়কাঁপানো মীতের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ ও উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে রাশিয়া ২৯টি দেশের পুরুষদের ‘প্রতারণা বা জোরপূর্বক’ তাদের সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ দিয়েছে, যাতে তারা ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে পারে।
যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর জন্য ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সি পুরুষদের বেছে নেওয়া হচ্ছে। এসব ব্যক্তি মূলত ‘অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’ থেকে আসা। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ও শিক্ষার হারও খুব কম।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিদেশ থেকে কর্মী সংগ্রহের নামে এক মানবপাচার চক্রের তৎপরতা। ২০২৪ সাল থেকেই সুনির্দিষ্ট কিছু দেশ ও অঞ্চলকে টার্গেট করে এই চক্রগুলো সক্রিয়।
তদন্ত কমিশন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মোট ৪৮টি দেশের নাগরিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান বা মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণা, জবরদস্তি এবং মানবপাচারের প্রমাণ পেয়েছে।
এই চক্রের খপ্পরে পড়া ব্যক্তিদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তাদের বেশিরভাগই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সচেতনতার মাত্রা তুলনামূলক কম।
এই বাস্তবতাকে পুঁজি করে পাচারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করে। রাশিয়ায় সিকিউরিটি গার্ড, গাড়িচালক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, কনস্ট্রাকশন শ্রমিক বা ওয়েল্ডারের মতো বেসামরিক চাকরিতে লোভনীয় বেতনের কথা বলা হয়।
কোথাও খেলাধুলা, কৃষি বা তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিশেষ ক্ষেত্রের কাজের সুযোগ দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাসও দেওয়া হয়। তদন্ত কমিশন বলছে, প্রতারণার এই ফাঁদ এতটাই নিখুঁত ও বিশ্বাসযোগ্য হয় যে, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় পরিচিত মানুষ, এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা সরকার অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমেও প্রলুব্ধ হয়েছেন।
কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের ভুয়া অফার লেটার বা গ্যারান্টি পেপার দেওয়া হতো, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকত যে তাদের কোনো অবস্থাতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে বা সামরিক কার্যক্রমে পাঠানো হবে না।
তদন্ত কমিশন কিছু বাংলাদেশিকে দেওয়া বিজনেস ভিসার কপি পেয়েছে, যেটি রাশিয়ার বেসামরিক কোম্পানিতে কাজের কথা বলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ায় পা রাখার পরেই তাদের সমস্ত চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। কেনিয়ার নাগরিকদের দুই সপ্তাহ থেকে দুই মাস মেয়াদী ট্যুরিস্ট ভিসার দেওয়ার তথ্য পেয়েছে কমিশন। তাদের কাজে জড়ানোর আইনগত সুযোগ নেই।
বাহরাইন, ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, তুরস্ক কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে বা কখনো কখনো নজরদারি এড়াতে সড়কপথে প্রতিবেশী দেশে নিয়ে সেখান থেকে বিমানে তাদের রাশিয়ায় জড়ো করা হতো। এজন্য দালালরা জনপ্রতি ৪০০ থেকে ৮ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত কমিশন বা যাতায়াত খরচ আদায় করেছিল, যা পরবর্তীতে তাদের বেতন থেকে কেটে নেওয়ার চুক্তি ছিল।
প্রতিবেদনে ক্যারিবিয়ান থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির ৩৫ বছর বয়সি স্ত্রী এক নারীর সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কথিত নিয়োগকর্তারা তার পাসপোর্ট নিয়ে নেয় ও তাকে চুক্তিতে শুধু নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় স্বাক্ষর করতে বলে। সেটা রুশ ভাষায় লেখা ছিল। তাকে বলপ্রয়োগ করা হয় এবং কোনো বিকল্প দেওয়া হয়নি।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পরপরই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তের জন্য জেনেভা-ভিত্তিক মানবাধিকার কাউন্সিল এই স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে।
গতকাল সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মানবাধিকার কমিটির কাছে পেশ করা এই প্রতিবেদনটি ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর রাশিয়ার ব্যাপক হামলার প্রথম কোনো দলিল। এই প্রতিবেদনের বিষয়ে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের মন্তব্যের অনুরোধ জানানো হলেও তারা সাড়া দেননি।
কমিশন বলেছে, তারা তাদের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে ২০২৫-২৬ সালে কিয়েভ ও আরও আটটি অঞ্চলে শীতকালীন প্রতিকূল পরিস্থিতি সহ্য করা ২৫৫ জন ইউক্রেনীয় ব্যক্তির বর্ণনার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক এবং নাগরিক সংগঠনগুলোর মতামতের ওপর ভিত্তি করে।




