logo

বিএনপি সরকারের ৩ আইনে দেশে মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হয়েছে: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

বিএনপি সরকারের ৩ আইনে দেশে মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হয়েছে: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
নতুন তিন আইনে বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ছবি: উইকিপিডিয়া

বাংলাদেশে সেপ্টেম্বর মাসে পাস হওয়া তিনটি নতুন আইন মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল করেছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহির সুযোগ কমিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

সংস্থাটি বলেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং জোরপূর্বক গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের ক্ষমতা বাড়াতে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। নতুন সরকার সেই সংস্কারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল বা দুর্বল করেছে বলে দাবি করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা কমেছে

৬ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হওয়া নতুন আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরাসরি তদন্ত করতে পারবে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। কমিশনকে অভিযোগে অভিযুক্ত সংস্থার কাছেই প্রতিবেদন চাইতে হবে।

তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা কোনো জবাব না দিলে বা তাদের প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে কমিশন নিজস্ব তদন্ত শুরু করতে পারবে—এমন একটি অস্পষ্ট বিধান আইনে রাখা হয়েছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে।

নতুন আইনে কমিশনের সদস্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা কমানো এবং আটককেন্দ্র পরিদর্শনের জন্য জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মর্যাদা ও স্বাধীনতা কমানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত সংস্কার এবং অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।

গুমের অভিযোগ তদন্তেও পরিবর্তন

৬ সেপ্টেম্বর সংসদে জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন পাস হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, নতুন আইনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের বেশ কিছু সুরক্ষা বাতিল করা হয়েছে।

নতুন আইনে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ তদন্ত করবে অভিযুক্ত সংস্থা ছাড়া অন্য একটি নিরাপত্তা সংস্থা, যা সরকার নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে গোপন আটককেন্দ্রের সন্দেহসহ বিভিন্ন আটকস্থল পরিদর্শন, পর্যবেক্ষণ ও তদন্তের যে ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল, সেটিও বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

কমান্ডের দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের ব্যবস্থায় কোনো কমান্ডার কোনো লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতেন বা জানা উচিত ছিল এবং তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে তাকে দায়ী করার সুযোগ ছিল। নতুন আইনে কোনো কমান্ডারকে জোরপূর্বক গুমের জন্য দায়ী করতে তার সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ প্রয়োজন হবে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি।

র‍্যাব বিলুপ্ত নয়, শুধু নাম পরিবর্তন: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

১০ সেপ্টেম্বর সংসদ বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়ন আইন পাস করে। এর মাধ্যমে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের নাম পরিবর্তন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, র‍্যাবের জনবল, ক্ষমতা, সম্পদ ও নথিপত্র নতুন বাহিনীতে স্থানান্তর করা হয়েছে। নতুন বাহিনীটি ১৬ সেপ্টেম্বর কার্যক্রম শুরু করেছে। এমনকি বাহিনীর লোগোতেও বড় কোনো পরিবর্তন করা হয়নি; শুধু র‍্যাবের জায়গায় বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়নের নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

র‍্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি, নতুন আইনে নতুন বাহিনীর জন্য পর্যাপ্ত মানবাধিকার সুরক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাধীন নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

সংস্থাটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নতুন বাহিনীর কার্যক্রমের বিধিমালায় কঠোর মানবাধিকার যাচাই, স্বাধীন তদারকি, গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে সুরক্ষা এবং র‍্যাবের পুরোনো নথি ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও বলেছে, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং অতীতের লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নতুন নামে গঠিত বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যসহ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নতুন সরকারের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

এলেইন পিয়ারসন বলেন, ব্যাপক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা আগের সরকারের পতনের পর তারেক রহমান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। কিন্তু নতুন সরকার দ্রুত শেখ হাসিনার সরকারের মতো দমনমূলক পথে এগোচ্ছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।