জুতা পালিশ থেকে প্রেসিডেন্ট ভবন, লুলার জীবনের নাটকীয় উত্থানপতন

ব্রাজিলের রাজনীতিতে দীর্ঘ সংগ্রাম, উত্থানপতন ও নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। জীবনের নানা ঘটনাকে একসময় অলৌকিক বলে বর্ণনা করা এই নেতার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে প্রেসিডেন্টের পদে পৌঁছানোর পর তাকে কারাবরণও করতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন তিনি।
রিও ডি জেনেইরো থেকে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে লুলার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার এবারের নির্বাচনি লড়াইও সহজ ছিল না। বয়স প্রায় ৮১ বছর হওয়ায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর জবাবে নির্বাচনি প্রচারের সময় তাকে ব্যায়াম করতে ও দৌড়াতে দেখা যায়। এর মাধ্যমে নিজের শারীরিক সক্ষমতার বিষয়ে সমর্থকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন তিনি।
প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারোর কাছে পিছিয়ে পড়ার পরও দমে যাননি লুলা। বরং দ্বিতীয় দফার প্রচারে নতুন কৌশল গ্রহণ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি নিজের ভিডিও ধারণ করে প্রচার শুরু করেন। এমনকি এ উদ্দেশ্যে প্রথমবারের মতো একটি মোবাইল ফোনও কেনেন তিনি।
ব্রাজিলের জনগণের একটি বড় অংশের দৈনন্দিন জীবন এখন অনলাইননির্ভর। পাশাপাশি দেশটির রাজনীতিতেও বিভাজন গভীর। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিক লুলার প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই ব্যবহার তার রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
দারিদ্র্য থেকে প্রেসিডেন্ট ভবনে
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা লুলার জীবনসংগ্রাম শুরু হয়েছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পেরনামবুকো রাজ্যে একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারে আট সন্তানের মধ্যে সপ্তম হিসেবে জন্ম নেন তিনি।
শৈশবে জীবিকার তাগিদে জুতা পালিশ ও চিনাবাদাম বিক্রি করেছেন লুলা। পরবর্তী সময়ে ধাতুশ্রমিক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে যুক্ত হন। ষাটের দশকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় তার একটি আঙুল কাটা পড়ে।
শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে পরিচিতি পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরপর তিনবার পরাজিত হন তিনি। অবশেষে ২০০৩ সালে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হয়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন লুলা।
তার শাসনামলে ব্রাজিলের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটে। সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে প্রায় তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশের কাছে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন তিনি।
দুর্নীতির অভিযোগ, কারাবাস ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন
ক্ষমতায় থাকার সময় লুলা ও তার দল ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ও কেলেঙ্কারির মুখে পড়েন। এসব ঘটনা ব্রাজিলের রাজনীতিতে জনঅসন্তোষ বাড়াতে ভূমিকা রাখে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে ডানপন্থী নেতা জইর বলসোনারো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
এর আগে দুর্নীতির মামলায় লুলাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আইনি ও প্রক্রিয়াগত কারণে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দণ্ডাদেশ বাতিল হয়। মামলার বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন বলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। তবে এসব আইনি সিদ্ধান্তকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতির সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।
বলসোনারোর শাসনামলে ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়। ২০২২ সালের নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়ে আবারও প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ফেরেন লুলা। দারিদ্র্য থেকে ক্ষমতায় উত্থান, কারাবাস এবং পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন ব্রাজিলের সাম্প্রতিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
সামাজিক কর্মসূচি ও পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগ
প্রেসিডেন্ট হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে লুলার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে ছিল পূর্ববর্তী সরকারের সময় ক্ষতিগ্রস্ত সামাজিক কর্মসূচিগুলো পুনরায় চালু করা, আমাজন বন ধ্বংসের হার কমানোর প্রচেষ্টা এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা।
দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’ কর্মসূচি তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় দুই দশক আগে চালু হওয়া এ কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া হয়। নির্বাচনের আগে এ কর্মসূচির ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেন তিনি।
তবে তার সরকারকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেক ভোটারের বিরোধিতার পাশাপাশি সরকারি ঋণ বৃদ্ধি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। উচ্চ সুদের কারণে ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সরকারি ব্যয় বাড়ানোর নীতিও অর্থনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে নতুন অধ্যায়
লুলার রাজনৈতিক সাফল্য ও বিতর্ক; দুটিই ব্রাজিলের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। একদিকে তার সমর্থকেরা দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষায় নেওয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে দুর্নীতির কেলেঙ্কারি, অর্থনৈতিক নীতি এবং অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে তার সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে তার জয় সমর্থকদের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে। তাদের একাংশের আশঙ্কা ছিল, ফ্লাভিও বলসোনারো ক্ষমতায় এলে নাগরিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে ব্রাজিলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অর্থনীতি, সামাজিক বৈষম্য, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও নানা সংকট পেরিয়ে লুলার প্রত্যাবর্তন তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি ব্রাজিলের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন।
