ট্রাম্পের এক হুমকিতে ডিজেল নিয়ে বড় সুখবর পাচ্ছে বিশ্ব

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে জি৭ভুক্ত দেশগুলো। একই সঙ্গে নিজেদের মধ্যে জ্বালানি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা।
শুক্রবার জি৭ নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সমন্বয়ে চার মাস ধরে এই মজুত বাজারে ছাড়া হবে। এর মধ্যে জি৭ সদস্য ও অংশীদার দেশগুলো প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়বে।
এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর জরুরি ডিজেল মজুত কমানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছিল, ইউরোপ পদক্ষেপ না নিলে ওয়াশিংটন ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। এমন নিষেধাজ্ঞা ইউরোপে ডিজেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারত। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল আমদানির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
তবে শুক্রবার হোয়াইট হাউস থেকে আলাবামার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেবে না। তিনি বলেন, বিষয়টি কখনোই বাস্তবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনায় ছিল না, যদিও গত দুই সপ্তাহে তিনি একাধিকবার জানিয়েছিলেন যে এমন নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করা হচ্ছে এবং তিনি এর পক্ষে ছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, “ইউরোপের কাছে প্রচুর ডিজেল রয়েছে এবং তারা বিশ্বে বড় ধরনের অবদান রাখতে যাচ্ছে। আমরাও তা করব। আমরা ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছি না। আমরা যা করার কথা, সেটিই করব।”
এরপর ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, “ইউরোপ বিপুল পরিমাণ মজুত ডিজেল তেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে। প্রক্রিয়াটি অবিলম্বে শুরু হবে।”
চার মাস ধরে চলবে মজুত ছাড়ার প্রক্রিয়া
জি৭-এর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বিবেচনায় নিয়ে আইইএর মাধ্যমে সমন্বিতভাবে ১০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া হবে। তবে নতুন এই ঘোষণার কতটা তেল মার্চের চুক্তির অবশিষ্ট মজুত থেকে আসবে, তা স্পষ্ট নয়।
আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল চলতি সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, মার্চে সম্মত হওয়া ৪০ কোটি ব্যারেল তেলের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে বাজারে ছাড়া হয়েছে।
নতুন মজুত ছাড়ার কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু হয়ে চার মাস চলবে। প্রথম ২০ দিনের মধ্যে জি৭ সদস্য ও অংশীদার দেশগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল ছাড়বে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
তবে অপরিশোধিত তেল, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের মধ্যে কোনটির কত পরিমাণ বাজারে ছাড়া হবে এবং কোন কোন দেশ এতে অংশ নেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
জি৭ আরও জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ডিজেল মজুত ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আইইএর আওতায় আলোচনা করা হবে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
ইরান যুদ্ধের কারণে মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে আইইএর সমন্বয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জরুরি তেল মজুত ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপও যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল আমদানির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় উৎপাদক দেশগুলো থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর পর চলতি বছর ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল আমদানি বাড়িয়েছে।
শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারগুলো ফ্রান্সের একটি প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা করে। ওই প্রস্তাবে ইউরোপীয় দেশগুলোর জরুরি মজুত থেকে ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল এবং আইইএর সদস্যদের কাছ থেকে আরও ৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছাড়ার কথা বলা হয়েছিল বলে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানিয়েছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়া হলে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট জরুরি ডিজেল ও গ্যাসঅয়েল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশের সমান হবে। এটি আবার জোটটির বার্ষিক ডিজেল ব্যবহারের প্রায় ৩ শতাংশের সমান।
মজুত ছাড়ার আলোচনা প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল ফিউচারের দাম ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে গ্যালনপ্রতি ৪ দশমিক ৪৯ ডলারে নেমে আসে। ইউরোপের বেঞ্চমার্ক ডিজেল ফিউচারও প্রায় ৮৩ ডলার বা ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে যায়।
জি৭-এর বিবৃতিতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি পণ্যের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
