logo

বিশ্ব ক্ষুধা সূচক: ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে বাংলাদেশ

বিশ্ব ক্ষুধা সূচক: ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে বাংলাদেশ
রাজধানী ঢাকার ফুটপাতে ‘ভালো কাজের বিনিময়ে খাবার’ পাচ্ছেন ছিন্নমূল মানুষ। ছবি: এএফপি

বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন ও যুদ্ধের বহুমাত্রিক প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। এমন প্রতিকূল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ক্ষুধা হ্রাসের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক অগ্রগতি উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়ে পড়েছে। ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে (জিএইচআই) বাংলাদেশের স্কোর ৪২ শতাংশের বেশি উন্নতি হলেও ২০১৮ সালের পর তা মাত্র ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকের (জিএইচআই) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। চলতি বছরের সূচকে ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। অর্থাৎ দেশের বর্তমান স্কোর ১৯ দশমিক ২। ২০১৮ সালে এই স্কোর ছিল ২০। সার্বিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ এখনও ‘মাঝারি’ ক্ষুধার শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের স্কোর ২৪ দশমিক ১, পাকিস্তানের ২৫ দশমিক ৫ এবং আফগানিস্তানের ২৮ দশমিক ৬। এই তিন দেশই ‘গুরুতর’ ক্ষুধার শ্রেণিতে রয়েছে। সে তুলনায় প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ভালো।

অন্যদিকে নেপাল (১৪ দশমিক ৫) ও শ্রীলঙ্কা (১০ দশমিক ২) বাংলাদেশের মতোই ‘মাঝারি’ ক্ষুধার তালিকায় স্থান পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সামগ্রিক স্কোর ২৩ দশমিক ৫, যা এই অঞ্চলে অনাহার ও খাদ্যসংকটের গুরুতর বাস্তবতাকে নির্দেশ করে।

জিএইচআই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশুদের কৃশতার (উচ্চতার তুলনায় কম ওজন) হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০১৮ সালের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে সর্বশেষ মূল্যায়নে এটি দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশে, যা ২০০০ সালের পর সর্বোচ্চ। তীব্র অপুষ্টির ইঙ্গিতবাহী এই সূচক শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি বজায় রেখেছে। শিশুদের খর্বাকৃতির (বয়সের তুলনায় কম উচ্চতা) হার ২০১৮ সালের ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অপুষ্টিতে ভোগা মোট জনসংখ্যার অনুপাত ১২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনকে ‘এক প্রজন্মের বড় অর্জন’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। ২০০০ সালে শিশুদের খর্বাকৃতির হার যেখানে ছিল ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখান থেকে তা ৩০ শতাংশের বেশি কমে ২৪ শতাংশে নামা অত্যন্ত ইতিবাচক। মূলত বাবা-মায়ের শিক্ষা বিশেষ করে নারীর শিক্ষার হার বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যের অগ্রগতি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসারের ফলেই এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাব মতে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ২১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগেছে, যা বিশ্বজুড়ে অপুষ্টিতে থাকা মোট মানুষের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। অতিবৃষ্টি, বন্যায় ফসলের ক্ষতি এবং চরম খরা ও প্রতিকূল আবহাওয়া এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

জিএইচআইতে চারটি সূচকের ভিত্তিতে ক্ষুধার মাত্রা পরিমাপ করা হয়। এগুলো হলো অপুষ্টি, শিশুর কৃশতা, শিশুর খর্বাকৃতি এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার। স্কোর যত কম, ক্ষুধার তীব্রতাও তত কম।

‘খাদ্যনিরাপত্তা ছাড়া কোনো নিরাপত্তা নেই’ (নো সিকিউরিটি উইদাউট ফুড সিকিউরিটি) এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়েলথাঙ্গারহিলফে, রুর বিশ্ববিদ্যালয় বোখুমের শান্তি ও সংঘাতবিষয়ক আইন ইনস্টিটিউট এবং সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা হেলভেটাস।

Global Hunger Index 2026