
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তিন ঘণ্টার বেশি বৈঠকের পরদিনই কিয়েভে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনে তাঁদের এটিই প্রথম সফর। জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর উইটকফ আলোচনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কুশনারের বক্তব্যেও ছিল দীর্ঘমেয়াদি শান্তির কথা।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আলোচনা ফলপ্রসূ হলেই কি যুদ্ধ শেষ করার মতো সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছানো গেছে? এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্য বলছে, উত্তরটা এতটা সহজ নয়।
আসল সংকট কোথায়?
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখনো দুটি—ভূখণ্ড এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা।
রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের দখলকৃত এলাকাগুলো নিয়ে নিজেদের দাবি ধরে রেখেছে। অন্যদিকে কিয়েভ রুশ বাহিনীকে আরও ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার দাবি মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন—যুদ্ধ বন্ধ হলে ইউক্রেনের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
কিয়েভ চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা ভবিষ্যৎ রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিক।
অর্থাৎ, মস্কো চাইছে যুদ্ধের সামরিক ফলাফল রাজনৈতিক স্বীকৃতি পাক; আর কিয়েভ চাইছে যুদ্ধ বন্ধ হলেও যেন ভবিষ্যতে আবার একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।
এই দুই অবস্থানের মাঝখানে সমঝোতা তৈরি করাই এখন ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাহলে কুশনার-উইটকফ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গুরুত্ব এখানেই যে, যুক্তরাষ্ট্র এবার একই ধারাবাহিকতায় দুই পক্ষের সঙ্গেই সরাসরি আলোচনা করছে।
মস্কোয় পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিরা যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে কয়েকটি ধারণা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।
এরপর কিয়েভে এসে জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনা করেছেন তাঁরা।
এটি ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত এমন একটি সমঝোতার কাঠামো খুঁজছে, যা শুধু যুদ্ধবিরতি নয়—যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও অন্তর্ভুক্ত করবে।
তবে সেই কাঠামোর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
ইউরোপকে পাশে রাখছে কিয়েভ
কিয়েভের আলোচনায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ইউক্রেনের কাছে শান্তি শুধু রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কোনো সমঝোতার বিষয় নয়। ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত।
জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেছেন—যুদ্ধ চলতে থাকলে ইউরোপীয় সমর্থন ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে কিয়েভের কৌশলও পরিষ্কার: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি ইউরোপীয় মিত্রদেরও শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ রাখা।
যুদ্ধক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র
কূটনীতিকরা যখন আলোচনা করছেন, তখন যুদ্ধক্ষেত্রে সংঘর্ষ থামেনি।
রাশিয়া ইউক্রেনের সামরিক অবকাঠামো ও ড্রোন সংরক্ষণাগারে হামলার দাবি করেছে। ইউক্রেনও রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টা হামলার দাবি করেছে।
মস্কো ও কিয়েভে সাময়িকভাবে হামলা না চালানোর অঙ্গীকার হলেও অন্য এলাকায় যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে।
এখানেই শান্তি উদ্যোগের সবচেয়ে বড় বাস্তব সমস্যা।
কারণ কোনো পক্ষ যদি মনে করে যুদ্ধক্ষেত্রে আরও ভালো অবস্থান তৈরি করা সম্ভব, তাহলে আলোচনার টেবিলে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার আগ্রহ কমে যায়।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির চেয়ে প্রথমে সীমিত যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাই তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত।
এরপর ধাপে ধাপে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে ভূখণ্ডের প্রশ্ন যদি শুরুতেই অমীমাংসিত থাকে, তাহলে যেকোনো যুদ্ধবিরতিই ভঙ্গুর হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
আর ইউক্রেন যদি বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা না পায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তিতে যাওয়াও কঠিন হবে।
কুশনার ও উইটকফের মস্কো-কিয়েভ সফর নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা।
কিন্তু এটিকে এখনই যুদ্ধ শেষ করার পথে বড় সাফল্য বলা যাবে না।
বরং এটি একটি সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়ার নতুন দরজা খোলার চেষ্টা।
ওয়াশিংটনকে এখন প্রমাণ করতে হবে—তারা শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারে না, বরং দুই পক্ষের সবচেয়ে কঠিন মতপার্থক্যগুলোতেও বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থামবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করবে একটি প্রশ্নের ওপর—
রাশিয়া ও ইউক্রেন কি এমন একটি সমঝোতায় রাজি হবে, যেখানে কেউই পুরোপুরি জিতবে না, কিন্তু দুপক্ষই যুদ্ধ বন্ধ করার মতো কিছু পাবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই এখন নজরে পুরো বিশ্বের।
