logo

প্রথমবার কক্ষপথে পৌঁছাল স্পেসএক্সের স্টারশিপ, ২৬ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ

এএফপি
এএফপি
প্রথমবার কক্ষপথে পৌঁছাল স্পেসএক্সের স্টারশিপ, ২৬ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ
স্পেসএক্স-এর মেগা রকেট স্টারশিপ সোমবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর, টেক্সাসের স্টারবেস থেকে একটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছে। ছবি: এপি

স্পেসএক্সের বিশালাকৃতির রকেট স্টারশিপ প্রথমবারের মতো পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছেছে এবং সেখান থেকে ২৬টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে। তবে প্রায় তিন ঘণ্টার মাথায় মহাকাশযানটিকে প্রশান্ত মহাসাগরে নামিয়ে আনা হয়। সোমবারের এই পরীক্ষা ইলন মাস্কের উচ্চাভিলাষী মহাকাশ পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১২০ মিটারেরও বেশি উচ্চতার কালো-রুপালি স্টারশিপটি সোমবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থিত স্পেসএক্সের ঘাঁটি থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। পরিকল্পনা ছিল, এটি প্রায় ১০ ঘণ্টা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করবে।

উৎক্ষেপণের পর সুপার হেভি বুস্টার সফলভাবে আলাদা হয়ে পানিতে অবতরণ করে। এরপর স্টারশিপের ওপরের অংশ কক্ষপথে পৌঁছায়। তবে যাত্রাপথে কয়েকটি ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেওয়ায় মিশনটি সফলভাবে এগোবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

স্পেসএক্সের উৎক্ষেপণ দলের এক সদস্য লাইভ সম্প্রচারে বলেন, “স্টারশিপ কক্ষপথে পৌঁছেছে।” এ সময় সেখানে উপস্থিত স্পেসএক্স কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

কক্ষপথে পৌঁছানোর কয়েক মিনিট পর স্টারশিপ থেকে নতুন প্রজন্মের স্টারলিংক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ শুরু হয়। এসব স্যাটেলাইট স্পেসএক্সের বিশাল স্যাটেলাইট-ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার কথা। স্টারলিংক বর্তমানে কোম্পানিটির গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎসগুলোর একটি।

তবে উৎক্ষেপণের প্রায় তিন ঘণ্টা পর প্রকৌশলীরা স্টারশিপকে কক্ষপথ থেকে সরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন। লাইভ সম্প্রচারের দৃশ্যে দেখা যায়, মহাকাশযানটি সোজা অবস্থায় বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে দ্রুত নিচে নামছে। এরপর এর ইঞ্জিন পুনরায় চালু হয়ে অবতরণের গতি কমায়।

পানিতে প্রায় উল্লম্বভাবে অবতরণের পর স্টারশিপটি এক পাশে কাত হয়ে যায় এবং পরে বড় ধরনের বিস্ফোরণে আগুনে গ্রাস হয়।

ইলন মাস্কের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে স্টারশিপকে দ্রুত পুনর্ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযানে পরিণত করা হবে। পরিকল্পিত ব্যবস্থায় বিশেষ প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে রকেটটি মাটি বা পানিতে পড়ার আগেই ধরে ফেলার কথা।

সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ

টেক্সাসে কয়েক বছর ধরে উন্নয়ন ও পরীক্ষার পর ২০২৩ সালে পূর্ণাঙ্গ কনফিগারেশনে স্টারশিপের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন শুরু করে স্পেসএক্স। এরপর সফলতা ও ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মহাকাশযানটিতে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তবে ইলন মাস্কের চাঁদ ও মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। এর মধ্যে কক্ষপথে মহাকাশযানে জ্বালানি স্থানান্তর বা পুনরায় জ্বালানি ভরার প্রযুক্তি সফলভাবে প্রমাণ করাও অন্যতম।

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসাও চাঁদের পৃষ্ঠে মার্কিন নভোচারীদের ফিরিয়ে নেওয়ার মিশনে স্টারশিপের পরিবর্তিত সংস্করণ ব্যবহারের ওপর নির্ভর করছে।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সিকিউরিটি এন্ড এমেজিং টেকনোলজির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ক্যাথলিন কার্লি এএফপিকে বলেন, সোমবারের পরীক্ষা “সম্পূর্ণ সফল” না হলেও এতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

তার মতে, স্টারশিপের উড্ডয়ন ও কক্ষপথে পৌঁছানো অবশ্যই অর্জন। তবে স্পেসএক্সের নিজস্ব লক্ষ্য অনুযায়ী ১০ ঘণ্টার ফ্লাইট সম্পন্ন হয়নি এবং ইঞ্জিনে সমস্যাও দেখা দিয়েছে।

প্রত্যাশা নিয়েও চাপ

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছয়বার পৃথিবী প্রদক্ষিণের পর স্টারশিপের প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি মাত্র দুইবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে।

অন্যদিকে বিশালাকার সুপার হেভি বুস্টারটি টেক্সাসের উপকূলের কাছে পানিতে অবতরণ করে। এবার সেটিকে উৎক্ষেপণকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেনি স্পেসএক্স।

এর আগে কোম্পানিটি উৎক্ষেপণকেন্দ্রে স্থাপিত বিশাল ‘চপস্টিক’ আকৃতির বাহুর সাহায্যে সুপার হেভি বুস্টার সফলভাবে ধরে দেখিয়েছে।

কার্লির মতে, প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু উড্ডয়ন সম্পন্ন করা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করাও সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে দর্শক ও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ভিন্ন।

তিনি বলেন, স্পেসএক্সকে “দৃষ্টিনন্দন পরীক্ষা” চালাতে হয়, কারণ এর চেয়ে কম কিছু হলে সেটিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হতে পারে।

স্টারশিপের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় একাধিকবার বিলম্ব হয়েছে। একই সময়ে চীনের একটি কোম্পানিও পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তিতে অগ্রগতি করেছে।

তবে আংশিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফ্যালকন রকেটের সাফল্যের কারণে বিশ্বব্যাপী মহাকাশ উৎক্ষেপণ বাজারে স্পেসএক্স এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকি নেওয়াকে কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে তার কার্যক্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরেছে।

স্টারশিপের এই পরীক্ষার পর চলতি সপ্তাহেই স্পেসএক্সের আরও তিনটি রকেট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে একটি উৎক্ষেপণে নভোচারীদের একটি দলকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো হবে।