পশ্চিমবঙ্গে আজান বন্ধে খুলে নেওয়া হচ্ছে মসজিদের মাইক

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় মসজিদের মাইক খুলে ফেলার ঘটনায় নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অপব্যাখ্যা করে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার দাবি করেছে, ধর্মীয় পরিচয় নয়, শব্দবিধি বাস্তবায়নেই এই অভিযান চালানো হচ্ছে।
সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের অভিযোগ, রাজ্যের কট্টরপন্থির বিজেপি সরকার পর্যায়ক্রমে মসজিদের কিংবা প্রকাশ্যে আজান দেওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপের পথেই হাঁটছে। আর এই লক্ষ্যে তারা শব্দদূষণের অজুহাতে মসজিদের মাইক খুলে নিতে বাধ্য করছে।
পশ্চিমবঙ্গের আবাসিক এলাকাগুলোতে দিনের বেলা ৫৫ ডেসিবেল ও রাতে ৪৫ ডেসিবেলের মধ্যে শব্দের মাত্রা সীমাবদ্ধ রাখার নিয়ম রয়েছে। রাজ্যের নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ও শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, আইন সবার জন্য সমান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে নির্দেশিকা অমান্য করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এর আগে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘যে যার ধর্ম তার বাড়ির মধ্যে পালন করলেই ভালো হয়। মাইক লাগানোর প্রয়োজন কী?’ দলের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা দিলীপ ঘোষও জোর দিয়ে বলেন, অন্যের অসুবিধা এড়িয়ে সবারই সাউন্ড নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। এক্ষেত্রে জোর করে কিছু করানোর দরকার নেই।
অন্যদিকে মুসলিম নেতারা এবং আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯৬ সালের কলকাতা হাইকোর্ট কিংবা পরবর্তী সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মাইক পুরোপুরি বন্ধ বা নামিয়ে ফেলার কথা বলা হয়নি; বরং নির্দিষ্ট ডেসিবেল বা শব্দের মাত্রা বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
ঘটনাটির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক নজরুল ইসলাম বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে নির্দিষ্ট শব্দসীমার মধ্যে মাইক ব্যবহারে আপত্তি নেই। কিন্তু কোনো লিখিত সরকারি নির্দেশিকা ছাড়া পুলিশ জোরপূর্বক মাইক খুলতে এলে তার প্রতিরোধ না করে ভিডিও ধারণ ও আইনি ব্যবস্থার পথ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
আব্বাস সিদ্দিকর দল আইএসএফের বিধায়ক ও ফুরফুরা শরীফের প্রতিনিধি নওশাদ সিদ্দিকী এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, লিখিত আদেশ ছাড়া মৌখিকভাবে পুলিশের এই পদক্ষেপ সংবিধানের ১৪, ১৯, ২১ এবং ২৫-২৮ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। পুলিশি অভিযানের সুনির্দিষ্ট এসওপি প্রকাশের দাবি জানানোর পাশাপাশি তিনি কলকাতা হাইকোর্টে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেন, ‘শব্দদূষণ মন্দির-মসজিদ সব ধর্মীয় স্থান থেকেই হতে পারে। ক তা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। তবে একতরফাভাবে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হলে তা সংহতির জন্য ক্ষতিকর হবে।’
অনুরূপ সুর মিলিয়ে সিপিএম নেতা ও আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সীমার মধ্যে রেখে শব্দ বাজানো উচিত। নাগরিকরা নিয়ম মানলে পুলিশ এভাবে সরাসরি গিয়ে মাইক সরাতে পারে না।’
উত্তপ্ত এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশন শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলত্যাগী তিন সংখ্যালঘু এনসিপিআই এমপি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করে মাইক খুলে নেওয়ার লিখিত অভিযোগ ও ভিডিও প্রমাণ জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
