ইতালিতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও হাজারো মানুষের বিক্ষোভ, বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ

গত সপ্তাহের সহিংসতার পর ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ধরপাকড়ের মধ্যেও শনিবার ইতালির বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভের ঘটনায় নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে আটক করে আটটি শহরের পুলিশ স্টেশনে নেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী সরকার চলতি সপ্তাহে জনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুমোদন করে। বিক্ষোভের আগে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের তল্লাশি ও গ্রেপ্তার অভিযানও চালানো হয়।
মিলানে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২৪ বছর বয়সী বেটিং শপের কর্মী আলেসিও স্কিমোনে বলেন, মিছিল করা মানুষের অধিকার এবং নিজেদের দাবি তুলে ধরতে তাঁদের রাস্তায় নামতে হবে।
শনিবার মিলানে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেন। এতে শহরের কেন্দ্রস্থলে যান চলাচল ব্যাহত হয়। একইভাবে রাজধানী রোমেও হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এ সময় কয়েকজন বিক্ষোভকারী অল্প সময়ের জন্য ঐতিহাসিক কলোসিয়ামের ভেতরে প্রবেশ করেন।
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থান
ইতালির বার্তা সংস্থা আনসার বরাত দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি বলেন, পুলিশ পেশাদারত্ব ও সংযমের সঙ্গে সহিংসতায় জড়িত গোষ্ঠীগুলোকে আলাদা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। তিনি আরও বলেন, দেশে কেউ আইন ভেঙে দায়মুক্তি নিয়ে কাজ করতে পারবে না।
গত সপ্তাহে মিলানের ফ্যাশনশিল্পের কেন্দ্রস্থলে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় শনিবার শহরের বেশ কয়েকটি দোকান আগেভাগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জানালা কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। তবে শহরের মেয়র জিউসেপ্পে সালা আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানানোর পর কিছু দোকান খোলা রাখা হয়েছিল।
বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড ফিলিপ প্লেইনের একটি পুরুষদের পোশাকের দোকানের কর্মী ৩০ বছর বয়সী আলেসান্দ্রো বুনে বলেন, বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতিতে তারা ভয় পাচ্ছেন না; এ বার্তাই দিতে চান। তার মতে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে পর্যটকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাই দোকানে এলে তারা নিরাপদ থাকবেন, সেটি নিশ্চিত করতে চান।
অন্যদিকে, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তামূলক সংস্থা এমএসএফের হয়ে তহবিল সংগ্রহ করা ৫৫ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবী স্টেফানিয়া সেগালিনা জানান, সংঘর্ষ না হওয়ায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও তিনি তহবিল সংগ্রহের কাজ বন্ধ করেননি। তার মতে, রাস্তায় পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি থাকায় নিরাপত্তার বিষয়ে কিছুটা নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভ দমনে নতুন বিধিনিষেধ
গত সপ্তাহের সংঘর্ষের পর মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েন করে ইতালি সরকার। পাশাপাশি নতুন এক সরকারি ডিক্রিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের আটকসংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। বিক্ষোভে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কারণে ক্ষয়ক্ষতি হলে তাদের অভিভাবকদের জরিমানা করার বিধানও রাখা হয়েছে।
শনিবার পুলিশ আরও জানায়, ‘অক্টোবর ১৭ আন্দোলন’ নামে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া একটি গোষ্ঠীর প্রধান সংগঠক বলে সন্দেহ করা ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে সরকারের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার সমালোচনা করেছে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, জনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের উত্থাপিত সমস্যাগুলোর সমাধানেও সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। সামরিক খাতে ব্যয় কমিয়ে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছে তারা।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে বাড়ছে অসন্তোষ
আবাসন, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থী, ট্রাকচালক ও কৃষকদের ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে এসব বিক্ষোভ হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ দেশটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে চলতি সপ্তাহে আর্থিক পদক্ষেপ অনুমোদন করেছে ইতালি সরকার।
এদিকে, দক্ষিণ ইতালিতে ট্রাকচালকদের অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহের সংকটের অবসান হয়েছে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে চলমান অসন্তোষ দেশটির পরিস্থিতিকে এখনো উত্তেজনাপূর্ণ করে রেখেছে।
