আবারও ইসলামবিদ্বেষের অভিযোগ, বিশ্বজুড়ে তোপের মুখে গুগল

বিশ্বের শীর্ষ সার্চ ইঞ্জিন টেক জায়ান্ট গুগলের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চ্যাটবট ও এলএলএম মডেল ‘জেমিনির’ বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষী পক্ষপাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মুসলিম ও ইসরায়েলিদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন অ্যালগরিদমিক প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করায় সর্বস্তরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি।
শনিবার (২১ আগস্ট) ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ইমাম ও অধিকারকর্মী ড. ওমর সুলাইমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টির প্রমাণ তুলে ধরে দুটি স্ক্রিনশট পোস্ট করলে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে গুগল।
ওই স্ক্রিনশটে দেখা যায়, ‘আমি একজন মুসলিমের সঙ্গে একা আছি’ বাক্যটি লিখে গুগলের ‘এআই ওভারভিউ’-এর কাছে অনুসন্ধান করা হলে জেমিনি সতর্কবার্তার সুরে উত্তর দিয়েছে। বলেছে, ‘আপনি যদি নিজেকে অনিরাপদ মনে করেন বা কোনো জরুরি পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তবে অনুগ্রহ করে ওই স্থান ত্যাগ করুন অথবা অবিলম্বে ৯১১-এ কল করুন।’
অন্যদিকে, একই প্রেক্ষাপটে ‘আমি একজন ইসরায়েলির সঙ্গে একা আছি’ অনুসন্ধানের বিপরীতে গুগলের এআই সম্পূর্ণ ইতিবাচক উত্তর দিয়েছে। বলেছে, ‘একজন ইসরায়েলি ব্যক্তিও অন্য সবার মতোই একজন স্বতন্ত্র মানুষ।’ এতে বিপদ সূচক বা জরুরি নম্বর ৯১১-এর কোনো উল্লেখই ছিল না।
তবে দুটি সমজাতীয় প্রশ্নের জবাবে জেমিনির এমন বৈষম্যমূলক ও নিরাপত্তা হুমকি নির্দেশক ভাষা নেটিজেন ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মাঝে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পোস্টে গুগলকে উদ্দেশ করে ড. ওমর সুলাইমান লিখেছেন, ‘ইসলাম নিয়ে আপনাদের সার্চ বা অনুসন্ধানের ফলাফল কতটা ভয়াবহ ছিল, তা থেকে কি আপনারা কোনো শিক্ষা নেননি? এখন আপনাদের এআই কি অনায়াসেই ইসলামবিদ্বেষী আচরণ করছে?’

বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরে আসার পর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কানাডার অন্টারিও প্রদেশের স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিবিদ ডলি বেগম।
তিনি তার এক্স অ্যাকাউন্টে লেখেন, “ওমর সুলাইমানের পোস্ট দেখে বিষয়টি আমি নিজে যাচাই করে দেখেছি। বহুল ব্যবহৃত একটি এআই চ্যাটবট যখন অন্যদের মানবিকতার সূক্ষ্ম দিকগুলো বিবেচনায় নেয় অথচ মুসলমানদের সরাসরি ‘হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরে, তখন সেই অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতিত্ব আমাদের সবার জন্যই গভীর উদ্বেগের।”
ডলি বেগম এআই মডেল প্রশিক্ষণের প্রযুক্তিগত দিক তুলে ধরে আরও বলেন, “এআই চ্যাটবটগুলো তাদের ডেটাসেট প্রসেসিংয়ের সময় ইন্টারনেটজুড়ে থাকা প্রচলিত ভুল ধারণা ও ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার সংস্পর্শে এসে সেটাই আউটপুটে প্রতিফলিত করতে পারে। কিন্তু সেই পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি যখন গুগলে আপাতদৃষ্টিতে ‘নিরপেক্ষ তথ্য’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তখন ঘৃণা ও বৈষম্য স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গণ্য হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।”
তিনি আরও বলেন, “তরুণ প্রজন্ম এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিখছে। এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বিষয়টিকে কেবল একটি ‘কারিগরি ত্রুটি’ বলে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। গুগলের উচিত কীভাবে এমনটা ঘটল তা ব্যাখ্যা করা এবং সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা।”
গুগল ‘এআই ওভারভিউ’-এর ভুলের ইতিহাস
এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ‘এআই ওভারভিউ’ চালুর মাত্র দুই সপ্তাহের কম সময়ে সমালোচনা মুখে পড়েছিল গুগল। কারণ ‘এআই ওভারভিউ’ তখন ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছিল। তখন থেকেই ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি উদাহরণে দেখা গেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে কতজন মুসলিম প্রেসিডেন্ট ছিলেন’ জানতে চাইলে এআই ওভারভিউ সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক এইচ ওবামাকে মুসলিম প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আরেক ব্যবহারকারী পিৎজায় চিজ আটকে না যাওয়ার উপায় জানতে চাইলে এআই ওভারভিউ সসের সঙ্গে বিষমুক্ত আঠা মেশানোর পরামর্শ দিয়েছে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা এর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে একটি পুরোনো রেডিট মন্তব্য খুঁজে পান।
চিকিৎসা ও বিজ্ঞানসংক্রান্ত প্রশ্নেও দেখা গেছে একই ধরনের সমস্যা। ‘কতক্ষণ সূর্যের দিকে তাকানো নিরাপদ’ জানতে চাইলে টুলটি কয়েক মিনিট সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানোর পরামর্শ দিয়েছে। আবার ‘প্রতিদিন কতটি পাথর খাওয়া উচিত’ প্রশ্নের উত্তরে মানুষের প্রতিদিন অন্তত একটি ছোট পাথর খাওয়া উচিত বলেও দাবি করেছে।


