নারী আন্দোলনে উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ, পুলিশের লাঠিচার্জ

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন হাজার হাজার নারী। অভিযোগ, সরকারের প্রতিশ্রুত ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ নামের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের ৩ হাজার টাকা করে পাননি তারা। যথাযথ নিয়মে আবেদন করা হলেও দুর্নীতি ও অনিয়ম করে প্রকল্প-সুবিধা থেকে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জের অভিযোগও তুলেছেন নারী আন্দোলনকারীরা।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাজ্যজুড়ে দফায় দফায় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনরত নারীদের অভিযোগ, সমস্ত নথিপত্র জমা দেওয়া এবং আবেদন অনুমোদিত হওয়ার পরেও তাদের অ্যাকাউন্টে প্রতিশ্রুত ৩ হাজার টাকা ঢোকেনি। গত ২০ আগস্ট নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর তাদের ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটিতে রেললাইনে নেমে অবরোধ করেন কয়েকশ নারী। এর জেরে দুপুর ১টা ৩৫ মিনিট নাগাদ শিয়ালদহগামী ডাউন লোকাল ট্রেন আটকে যায় এবং এক ঘণ্টারও বেশি সময় ওই শাখায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। হাবড়াতেও পুরসভা ও রেললাইনে বিক্ষোভ চালানো হয়।
বিক্ষোভের আঁচ লেগেছে কলকাতাতেও। ফুলবাগান থানার সামনে ও বেহালা চৌরাস্তায় পথ অবরোধের ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া আলিপুরদুয়ারের ধূপগুড়িতে ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।
পাশাপাশি বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর ও বড়জোড়া, মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুর এবং হুগলির চণ্ডীতলাতেও বিডিও ও মহকুমাশাসকের দপ্তরে বিক্ষোভ দেখা যায়। বিক্ষোভকারীদের একটাই দাবি, বারবার হয়রানি বন্ধ করে যোগ্য সুবিধাভোগীদের সকলকেই দ্রুত টাকা প্রদান করতে হবে।
পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসকের দপ্তরে বৈঠক চলাকালীন নারীদের চরম বিক্ষোভের মুখে পড়েন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি পূর্বনির্ধারিত বৈঠক ছেড়ে নিচে নেমে আসেন এবং ক্ষুব্ধ নারীদের কথা শোনেন।
তিনি আশ্বাস দেন যে, নথি যাচাই প্রক্রিয়ায় কেন সমস্যা হয়েছে তা তিনি খতিয়ে দেখবেন এবং এসডিও বা বিডিও অফিসে সঠিক নথিপত্র জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আগস্টের ২২ তারিখ পর্যন্ত প্রায় এক কোটির বেশি নারীকে এই যোজনার আওতায় টাকা দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকিরাও খুব দ্রুত এই সুবিধা পাবেন।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিজেপি নেতা ও মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার নিয়ে অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। এটাও পরিষ্কার জানা উচিত, সব সুবিধা সবার জন্য নয়। কেন্দ্রীয় সরকার নানা প্রকল্প করেছে, রাজ্য সরকারও করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর একটা সীমা আছে এবং ক্রাইটেরিয়া ঠিক করা আছে। এর মধ্যে যারা পড়বেন তারাই পাবেন। দানধ্যানে সবাইকে দেওয়া হবে, এই অভ্যাস খারাপ করে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এটা সবাইকে বুঝতে হবে যে এভাবে চলতে পারে না।’
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার রাজ্যের সব প্রাপ্তবয়স্ক নারীর জন্য ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ নামে একটি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু করেছিল। এই প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেক নারী তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৫০০ টাকা করে পেতেন।
পরবর্তীতে বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল, যেসব নারী লক্ষ্মীর ভান্ডার পান, তাদের প্রত্যেককেই ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আওতায় (লক্ষ্মীর ভান্ডারের পরিবর্তিত রূপ হিসেবে) প্রতি মাসে ৩ হাজার রুপি করে দেওয়া হবে।
তবে সরকার গঠনের পর প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। তারা দাবি করে, যেসব পরিবার স্বাবলম্বী ও আর্থিকভাবে সচ্ছল, তাদের এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে না।
পাশাপাশি টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক জটিল ও কঠিন শর্ত যুক্ত করা হয়। ফলে পুরোনো উপভোক্তাদের একটি বড় অংশ এই সুবিধা থেকে বাদ পড়েন। এর জেরেই রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অসন্তোষ; কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও ট্রেন আটকানো, আবার কোথাও মন্ত্রীদের ঘেরাও করে বিক্ষোভ চালানো হয়।


