ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে: ইরান

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই দেশের আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি আর কখনোই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না।
রোববার (২ আগস্ট) ইরানের মন্ত্রিসভায় উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, তেহরান ও মাসকাটের মধ্যে চলমান আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং তা বাস্তবায়নের খুব কাছাকাছি রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটি নতুন সামুদ্রিক রুট তৈরির ক্ষেত্রে ওমান ও ইরান ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন একটি নতুন নৌপথের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে যাচ্ছি, যা উত্তর বা দক্ষিণ কোনো নির্দিষ্ট রুট নির্দেশ করবে না। তবে এই রুট উভয় দেশের সার্বভৌম অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে এবং ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে শতভাগ সুরক্ষা দেবে।’
বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান ও ওমান উভয় দেশের জলসীমা এই প্রণালির সঙ্গে যুক্ত। প্রস্তাবিত নতুন রুটের বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে না এলেও, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে তেহরান।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা, পারমাণবিক সক্ষমতা রোধ এবং তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে দেশটিতে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পরবর্তীতে জুন মাসে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কেন্দ্রিক বিরোধের জেরে তা ভেঙে পড়ে এবং জুলাইয়ে ফের যুদ্ধ শুরু হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই জানান, ওমানের সঙ্গে নতুন রুট নিয়ে যে সমঝোতা হচ্ছে, তার সঙ্গে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা বা বন্ধ রাখার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রণারি বন্ধ থাকার পেছনে ওয়াশিংটনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে দায়ী করেন তিনি।
ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, ইরানের ওপর অবৈধ নৌ-অবরোধ তৈরি এবং বৈরী আচরণ করার কারণেই এই প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন বাঘাই।
এদিকে, আমেরিকার সঙ্গে হওয়া পূর্বের সমঝোতা স্মারক প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকটি ভবিষ্যতে তেহরানের বৈদেশিক নীতি ও সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন তাদের স্বাক্ষরিত প্রতিশ্রুতি মানতে বাধ্য হয়, সেই চেষ্টা ইরান চালিয়ে যাবে। এর মাধ্যমে তেহরান ও তার মিত্রদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার হবে।
অন্যদিকে, মধ্যস্থতাকারীরা জুনের সেই চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করতে চেষ্টা করছেন এবং তারা নিশ্চিত যে, হরমুজ প্রণারি সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র হাসাম ঘাশঘাবি। চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইরানি প্রতিনিধি দলের আবারও ওমানের রাজধানী মাসকাট সফরের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চলছে ট্রাম্পের ‘দ্বিমুখী বার্তা’ ও সামরিক প্রস্তুতি
সামগ্রিক কূটনৈতিক তৎপরতার মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, একটি চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর আর নতুন করে আক্রমণ করবে না। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প লেখেন, আমেরিকা সামরিকভাবে প্রস্তুত থাকলেও বিশ্বশান্তি ও ইরানের সমৃদ্ধির কথা বিবেচনা করে তিনি সাময়িকভাবে আক্রমণ স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছেন। তবে শর্ত হিসেবে তিনি অবিলম্বে সম্পূর্ণভাবে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকি পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের আগে শনিবার সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ফোনে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তীব্র সামরিক সংঘাতের পথ পরিহার করে আলোচনা ও উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, ইরানের ওপর ট্রাম্পের বড় আকারের নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তা বাতিল করার পরামর্শ দেন সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তেহরান থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিনিধি তৌহিদ আসাদি জানান, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে আবারও হামলার হুমকি দিচ্ছে—এই ধরনের দ্বিমুখী অবস্থানের সঙ্গে ইরান বেশ পরিচিত। ফলে ইরান কূটনৈতিক আলোচনার পথ যেমন খোলা রাখছে, তেমনি যেকোনো সামরিক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নিজেদের পূর্ণ প্রস্তুতিও বজায় রাখছে।


