logo

এবার শীতে তীব্র হতে পারে গ্যাস-সংকট, ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ এশিয়া

দ্য ইকোনমিস্ট
দ্য ইকোনমিস্ট
এবার শীতে তীব্র হতে পারে গ্যাস-সংকট, ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ এশিয়া
এলএনজিবাহী জাহাজের প্রতীকী ছবি

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সংকটে পড়েছে বিশ্ব। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আসন্ন শীত মৌসুমে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুধু ইউরোপ নয়, এই সংকটের ধকল পোহাতে হতে পারে এশিয়ার দেশগুলোকেও। রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে কাতারের গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছিল ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। কিন্তু সেই বিকল্প সরবরাহও এখন ঝুঁকির মুখে। ফলে এলএনজি সংকটে ইউরোপের তুলনায় এশিয়ার দেশগুলো আরও বেশি চাপে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গত মার্চে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। এরপর কাতার চুক্তিবদ্ধ ক্রেতাদের জানিয়ে দেয়, তারা চুক্তি অনুযায়ী সব এলএনজি সরবরাহ দিতে পারছে না। এরপর থেকে মাত্র ৯৮ কার্গো এলএনজি পাঠিয়েছে দেশটি।

২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৫৩৬টি এলএনজি কার্গো কম পাঠিয়েছে কাতার। ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। এটি গত বছরের বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ৯ শতাংশ।

সংকট এখনও কাটেনি। এশিয়ায় এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ২৫ ডলারে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় যা ১৪০ শতাংশ বেশি। তবে পরিস্থিতি এখনও ২০২২ সালের মতো ভয়াবহ হয়নি। সে বছর এলএনজির দাম সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ ডলারে উঠেছিল।

চলতি বছর এশিয়ার দেশগুলো এখন পর্যন্ত ১৯ কোটি ৩০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৭০ লাখ টন কম।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষেও এলএনজি সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে দেশে এ সংকট শুরু হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দেশে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শীতকালে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে গেলে এ পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ইউরোপে উদ্বেগ

ইউরোপের গ্যাসের মজুত এখন মাত্র ৭২ শতাংশ পূর্ণ আছে। বছরের এই সময়ে যা সর্বনিম্ন। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের একই সময়ে গড় মজুত ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। জার্মানির মজুত মাত্র ৫৭ শতাংশ।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিক্স ওয়ান কমোডিটিজ গত ১০ বছরের শীতের আবহাওয়ার তথ্য পরীক্ষা করে মডেলিং করেছে। তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির এত অবনতি হতে পারে যে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

ইউরোপীয় কমিশন অবশ্য এখনো নভেম্বরের মধ্যে গ্যাসের মজুত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার বাধ্যবাধকতা পুনর্বহাল করেনি। যুদ্ধের কারণে এই নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল।

শীত বাড়লে দাম উঠতে পারে ৪০ ডলারে

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষক ঝি শিন চং মনে করেন, শীত বেশি না পড়লে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে কাতারের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ইউরোপ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। তাতে গ্যাসের দাম কমে আসবে। তবে এই দুটি শর্তে অনিশ্চয়তা আছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, নভেম্বরে অপ্রত্যাশিতভাবে ঠান্ডা পড়লে ইউরোপে এলএনজি কেনার প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে। তখন প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের দাম ৩০ থেকে ৪০ ডলারে উঠতে পারে। শীত আরও দীর্ঘ হলে এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের প্রতিযোগিতা বাড়বে। সেই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তো আছেই।

কাতারের বিকল্প খুঁজছে বিশ্ব

কাতার এখনো এলএনজি উৎপাদনকেন্দ্রগুলো পুরোপুরি চালু করেনি। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে না তারা।

কাতারের এলএনজি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী শীতের আগে ইউরোপের মজুত পূরণ করতে অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি টন এলএনজি প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ২০২৭ সাল জুড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়তি থাকতে পারে, এমন আশঙ্কা আছে।

তবে বর্তমান সংকটের মধ্যে এলএনজি বাজারে আরেকটি বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে। যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে এলএনজির সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সেই হিসাব পাল্টে দিয়েছে।

অন্যদিকে সরবরাহ বাড়াতে বিভিন্ন দেশে যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু এখনো চলছে। ফলে বর্তমান সংকটের পর ভবিষ্যতে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ হতে পারে।