বাইন্যান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার হামলা, ৬৩০ কোটি ডলার চুরি

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্ল্যাটফর্মটির ডিজিটাল সম্পদ থেকে রেকর্ড প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার চুরি করে নিয়ে গেছে হ্যাকাররা।
এ ঘটনার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গ্রুপ জড়িত থাকতে বলে ধারণা শীর্ষস্থানীয় দুটি ব্লকচেইন বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠানের। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ চুরির খবরে বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে তীব্র ধস নেমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গভীর রাতে শুরু হয়ে প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে চুরির মূল ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা বাইন্যান্সের ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ওয়ালেটগুলো থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ওয়ালেটে অননুমোদিতভাবে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ দিতে পুরোপুরি সফল হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠান দুটির দাবি, ২০২৫ সালে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে ঘটা অনুরূপ একটি সাইবার চুরির ঘটনার সঙ্গে এবারের হামলার পদ্ধতির হুবহু মিল রয়েছে। ওই ঘটনার জন্যও মার্কিন তদন্তকারীরা পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকারদের দায়ী করেছিলেন। টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, এই হামলার নেপথ্যে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকিং ইউনিট রয়েছে এবং এ বিষয়ে তারা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।
এদিকে ইতিহাসের এই নজিরবিহীন হ্যাকিংয়ের পর বাইন্যান্স কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে প্ল্যাটফর্ম থেকে সব ধরনের অর্থ উত্তোলন (উইথড্রয়াল) সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করে। তবে প্রতিষ্ঠানটি আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের শতভাগ অর্থের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং তাদের মূল তহবিল সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে।
ইতোমধ্যে টেথার, সার্কেল ও ট্রাম্প-সমর্থিত ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়ালের মতো শীর্ষস্থানীয় স্টেবলকয়েন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ প্রায় ৩০০ কোটি ডলার দ্রুত জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে টেথার এককভাবে প্রায় ১৫৭ কোটি ডলার, সার্কেল ৮০ কোটি ডলার ও রিপল প্রায় ২০ কোটি ডলারের তহবিল আটকে দিয়েছে।
বাইন্যান্সের সহ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ব্যবহারকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্ল্যাটফর্মটির লেনদেন ও উত্তোলন সেবা স্বাভাবিক করা হবে।
প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে বাইন্যান্স জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানের এক প্রকৌশলীর হ্যাক হওয়া ল্যাপটপের মাধ্যমে এই নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। ওই কম্পিউটারের অ্যাক্সেস কাজে লাগিয়েই হ্যাকাররা সিস্টেমের মূল নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে।
জাপানের এক্সচেঞ্জ মাউন্ট গক্সের সাবেক প্রধান মার্ক কার্পেলেস মনে করেন, হামলাকারীরা বাইন্যান্সের অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ালেটের প্রাইভেট কি বা ব্যক্তিগত প্রবেশসংকেতের নিয়ন্ত্রণ হাতিয়ে নিয়েছিল।
এই সাইবার হামলার তাত্ক্ষণিক প্রভাবে বৈশ্বিক ক্রিপ্টো বাজারে বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে। ঘটনার পরপরই ৬ সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে নেমে আসে বিটকয়েনের দাম। ইথারের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে দাঁড়ায়। এ ছাড়া বাইন্যান্সের নিজস্ব টোকেন বিএনবি-র দাম ৫ শতাংশ কমে প্রায় ৭০৯ ডলারে নেমে আসে।
কয়েনবেস গ্লোবাল ও স্ট্র্যাটেজির মতো তালিকাভুক্ত ক্রিপ্টো কোম্পানির শেয়ারের দামেও বড় দরপতন দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদের হার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা ক্রিপ্টো বাজারে এই ঘটনা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় মারাত্মক আঘাত হানবে এবং ভবিষ্যতে কেন্দ্রীভূত এক্সচেঞ্জগুলোর নিরাপত্তা কাঠামোগত প্রশ্ন আরও জোরালো করবে।


