ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক ককরোচদের

ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য নিয়ে ভারতীয় পত্রিকা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভারতের নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ, এসআইআর স্থগিত, কমিশনের সিদ্ধান্তগুলির স্বাধীন তদন্ত এবং কয়েকটি রাজ্যে ভোটপ্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার দাবিতে একযোগে সরব হয়েছে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আম আদমি পার্টি, ডিএমকে এবং শিবসেনাসহ বিরোধী দলগুলো।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রকাশিত তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসআইআর নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি অগ্রাহ্য করে কি একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার?
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ মাসে ১৪ বার নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার সান্ধু ও জোশী। নির্বাচন কমিশনের একটি সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশিকা নিয়ে ১ দিনে ৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন তারা। কিন্তু কোনও বারই নাকি তাদের আপত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
আপত্তিগুলোর মধ্যে ছিল এসআইআর চলাকালীন ভোটার বাদ দেওয়া ও পুনর্বহাল, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন, ভোটার-তথ্যের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোটারসংক্রান্ত আপিলের প্রক্রিয়া।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে ফর্ম ৬ নিয়ে। নতুন ভোটারদের জন্য নির্ধারিত এই ফর্মে অতিরিক্ত প্রশ্ন যুক্ত করা হয়েছিল। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিবেক জোশী আপত্তি জানিয়েছিলেন যে নিয়ম সংশোধন না করে নির্ধারিত ফর্মে এই পরিবর্তন করা যায় কি না। পরবর্তী পর্যায়ে সান্ধুও আপত্তি জানান। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ও গোয়ার ভোটার তালিকা নিয়েও কমিশনের ভিতরে প্রশ্ন উঠেছিল। আর এমন ঘটনা প্রকাশ্যে চলে আসায় রীতিমতো উত্তাল এখন ভারতীয় রাজনীতি।
ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব
সংসদের দুই কক্ষেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হয়েছে। যে প্রস্তাবে অন্তত ১৯৩ জন সাংসদের স্বাক্ষর জোগাড় হয়েছে। যার মধ্যে লোকসভার ১৩০ জন ও রাজ্যসভার ৬৩ জন সাংসদ সই করেছেন।
পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ থেকে ভোটাধিকারে বঞ্চনা, অসাংবিধানিকভাবে প্রক্রিয়াসহ একাধিক অভিযোগে এবার সংসদে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চেয়ে সংসদে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পেশ করলেন বিরোধী শিবিরের সাংসদেরা। যার নেতৃত্বে ছিল কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস।
বৃহস্পতিবার সংবিধান হাতে সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘দেশ বিরোধী কাজ করেছেন জ্ঞানেশ কুমার। ভোট কেড়েছেন মানেই দেশদ্রোহী। অপরাধীদের শাস্তি পেতেই হবে। সব ফাঁস করব আমরা।’ এখানেই না থেমে লোকসভার বিরোধী দলনেতা বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগের সময়েও আপত্তি তুলেছিলাম। গণতন্ত্রের উপর এত বড় আক্রমণ আগে হয়নি। ভোটজালিয়াতি নিয়ে ছেড়ে কথা বলবে না কংগ্রেস। কারণ ভোট কাড়া হচ্ছে মানে গণতন্ত্রকেও ধ্বংস করা হচ্ছে।’ জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে রাহুল বলেন, ‘২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে ভোটচুরি হয়েছে, আমি একশো শতাংশ নিশ্চিত।’
সিজেপির ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
নির্বাচন কমিশনের বিতর্কে ঢুকে পড়েছে ককরোচরাও। সরাসরি জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবি করেছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলন করে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ইস্তফা দিতে হবে। যদি ইস্তফা না দেন, তাহলে ককরোচ জনতা পার্টি দিল্লিতে ধর্ণায় বসবে। দেশজুড়েই আন্দোলন শুরু হবে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কে উদ্দেশ করে দীপকে বলেন, ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো (আপনার খেলা শেষ হয়ে গিয়েছে)।’
সিজেপির সহপ্রতিষ্ঠাতা এদিন সৌরভ দাস তিনটি দাবি সামনে রাখেন। প্রথম, জাতীয় নির্বাচন কমিশনার পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা। দ্বিতীয়, জ্ঞানেশ কুমার ও যারা তাকে নির্দেশ দিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে আইনি মামলা এবং তৃতীয়, আসন্ন সমস্ত নির্বাচন আপাতত স্থগিত করে দেওয়া।
সিজেপির আরও দাবি, বর্তমান এসআইআর বাতিল করে ২০২৫ সালের ভোটার তালিকাই যেন ফিরিয়ে আনা হয়। সুপ্রিম কোর্টের কমিটির কাছে এসআইআরসংক্রান্ত সমস্ত নথি জমা রাখতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন বাতিল করতে হবে।
সিজেপির কো-কনভেনার আশুতোষ রাঙ্কা বলেন যে আবার রাস্তায় নামার প্রয়োজন রয়েছে। জেন-জি ও অন্যান্য সকলকে এই আন্দোলনে শামিল হতে আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ মহুয়ার
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। বৃহস্পতিবার এফআইআর দায়ের করার উদ্দেশ্যে তিনি থানায় গেলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ অভিযোগপত্র হিসাবে তা গ্রহণ করা হয়।
থানা থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মহুয়া মৈত্র তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার নিজের অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি তিনি ‘চুরি’ করেছেন বলেও বিস্ফোরক দাবি করেন তৃণমূল সাংসদ। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, এমন ব্যক্তির পদমর্যাদাজনিত বিশেষ কোনও রক্ষাকবচ থাকা উচিত নয়।
অভিযোগ দায়ের করার পাশাপাশি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মহুয়া। তিনি জানান, এই লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ যদি অবিলম্বে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেয়, তবে বিষয়টি নিয়ে জল বহুদূর গড়াবে এবং তারা পরবর্তী সম্ভাব্য সমস্ত আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেপ্তার করা ও তার ওপর দেশদ্রোহিতার মামলা চালানোর দাবি জানিয়েছেন দিল্লি আপ প্রধান ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
অন্যান্য বিরোধী দল গুলোর প্রতিক্রিয়া
সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব দাবি করেছেন, বর্তমান সিইসির অধীনে ভবিষ্যতের নির্বাচন না করা হোক। ডিএমকে এর এম কে স্ট্যালিন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন। শিবসেনার উদ্ভব গোষ্ঠীর উদ্ধব ঠাকরে নির্বাচন কমিশনারের গ্রেপ্তার ও নতুন করে নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। কর্নাটকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারও একই আহ্বান জানিয়েছেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেপ্তার ও ফৌজদারি তদন্তের দাবি করেছেন এবং আগের ভোটার তালিকা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বিধানসভা ভোটের দাবি তুলেছেন।
নির্বাচন কমিশনের বিবৃতি
বিতর্কের মধ্যে কমিশন জানিয়েছে, ‘কমিশন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাজ করে। কোনো বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে ভিন্ন মত থাকা অস্বাভাবিক নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই ধরনের আলোচনা ও মতবিনিময় হয়। কমিশনের ৩ সদস্যের পাশাপাশি অন্য আধিকারিকরাও নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে জানাতে পারেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় ঐক্যবদ্ধভাবেই।’
তবে এসবের মধ্যেই বৃহস্পতিবার নতুন করে বিজেপির তরফে কোনো বিবৃতি জারি করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদি নিজেও ‘সেবা সংকল্প যাত্রার’ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি দীর্ঘ বক্তব্য রাখলেও নির্বাচন কমিশন ইস্যুতে কোনো মন্তব্য করেননি।
