logo

আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন/ইসলামবিদ্বেষ ছড়িয়ে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর ‘কৌশলে’ রিপাবলিকানরা

এপি
এপি
ইসলামবিদ্বেষ ছড়িয়ে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর ‘কৌশলে’ রিপাবলিকানরা
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ। ছবি: আরব নিউজ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষী ও শরিয়াবিরোধী বক্তব্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক জোরালো হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকানদের এক সম্মেলনে সিনেটর টেড ক্রুজ ও গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটসহ প্রভাবশালী রাজনীতিকেরা দেশটিতে শরিয়া আইন নিষিদ্ধ করার পক্ষে বক্তব্য দেন। ‘মার্কিন বিচারব্যবস্থা ও সংবিধানে শরিয়া আইনের কোনো স্থান নেই’ রাজনীতিকদের এমন দাবির মুখে দেশটির মুসলিম নাগরিক, ধর্মীয় পণ্ডিত ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

তাদের ভাষ্য, শরিয়া সংবিধান বা বিচারব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপনের কোনো ব্যবস্থা নয়। বরং খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মীয় বিধানের মতো শরিয়াও মুসলমানদের জন্য নৈতিকতা এবং পারিবারিক জীবনের একটি নির্দেশনাব্যবস্থা। তাদের দাবি, রাজনৈতিক স্বার্থে শরিয়াকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে আমেরিকান মুসলমানদের অমানবিকীকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাছাড়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগমুহূর্তে ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর অপচেষ্টা করছে রিপাবলিকান নেতারা।

সংবাদ সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ডালাসে রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ বলেন, ‘আমেরিকায় শরিয়া আইনের কোনো স্থান নেই। আমাদের একজোট হয়ে এখনই এটি বন্ধ করতে হবে।’ তার এই বক্তব্যের পর টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি ‘টেক্সাসে শরিয়া আইন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার’ অঙ্গীকার করেন।

টেক্সাসসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের মুসলিম-আমেরিকান নেতা ও ইসলামি পণ্ডিতেরা বিগত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা ইসলামোফোবিয়ার সাম্প্রতিক উত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রচলিত ধর্মীয় বিধিবিধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

তাদের মতে, শরিয়া বা ইসলামি আইন মুসলমানদের জন্য ইতিবাচক দিকনির্দেশনা। শরিয়ার একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে এর মূল উদ্দেশ্য মুসলমানদের জীবনযাপন ও ইবাদতের জন্য একটি বিধান তৈরি করা। এর মধ্যে নামাজ, হজ, জাকাত, রোজা এবং ব্যক্তিগত সৎ গুণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত।

শরিয়ার অন্যতম সক্রিয় সমর্থক ইলিনয়ভিত্তিক সাবিল আহমেদ। তিনি ‘গেইনপিস’ নামের একটি প্রচার প্রকল্পের পরিচালক। ইসলাম সম্পর্কে প্রচার ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভ্রমণ করেন। সম্প্রতি তিনি টেক্সাসে তার কার্যক্রম বাড়িয়েছেন। সেখানে বিভিন্ন মসজিদ আয়োজিত কর্মশালা ও উন্মুক্ত আলোচনা সভায় নিয়মিত বক্তব্য রাখছেন।

টেক্সাসের প্লানোতে গ্রীষ্মকালীন সফর শেষে সাবিল আহমেদ ইনস্টাগ্রামে লেখেন, ‘শরিয়াকে প্রায়ই ভুল বোঝা হয়। অনেকে মনে করেন, শরিয়া মানেই কেবল শাস্তির বিষয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলামে এটি বিশ্বাস, ন্যায়বিচার, করুণা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে জীবনযাপনের জন্য আল্লাহর একটি নির্দেশনা।’

শরিয়াবিরোধী বিদ্বেষ টিকে থাকার জন্য সাবিল আহমেদ সেসব রাজনীতিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীদের দায়ী করেন, যারা নিজেদের ভোটার বা অনুসারীদের উসকে দিতে চান। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই বিদ্বেষ ছড়িয়ে ফায়দা নিতে চাওয়ার অভিযোগ তার। তিনি এপি-কে বলেন, ‘এসব বলে তারা জনপ্রিয়তা পায়। শরিয়া শব্দের সঠিক অর্থ কী, তা শেখানো মুসলমানদের দায়িত্ব। আমরা ক্রুদ্ধ বা বিদ্বেষী হতে পারি না।’

মুসলিম দেশগুলোতে শরিয়া আইনের ভিন্নতা

যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াবিরোধী বক্তব্যের সাম্প্রতিক উত্থানে মর্মাহতদের একজন আবদুল্লাহি আহমেদ আন-নাইম। সুদানে জন্ম নেওয়া এই ইসলামি পণ্ডিত আটলান্টার এমোরি ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল-তে বহু বছর শিক্ষকতা করেছেন। মুসলিম দেশগুলোতে জোরপূর্বক শরিয়া প্রয়োগকারী তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক সরকারের তিনি দীর্ঘদিনের সমালোচক। তার মতে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে মুসলমানরা ভালো থাকেন, যেখানে ধর্ম পালন তাদের স্বাধীন ইচ্ছার বিষয়।

আন-নাইম জানান, তিনি ও অন্যান্য মুসলিম-আমেরিকান আমেরিকান মূল্যবোধ গ্রহণের পাশাপাশি শরিয়াকে স্বেচ্ছায় তাদের পরিচয়ের একটি মূল অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, তাদের বিশ্বাসকে শয়তানের রূপ দেওয়া ‘শরিয়ার অর্থ সম্পর্কে এক চরম অজ্ঞতা’ প্রদর্শন করে। ‘এটা অপরের প্রতি চরম অমানবিকীকরণ, মানুষ হিসেবে তাদের অধিকারের অস্বীকৃতি।’

শরিয়ার বিরোধীদের বক্তব্যেও একই ধরনের তীব্রতা রয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ টেক্সাসের দুই মার্কিন প্রতিনিধি, রিপাবলিকান কিথ সেল ও চিপ রয়। তারা কংগ্রেসে যৌথভাবে ‘শরিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস’ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

চিপ রয় চলতি বছরের শুরুতে বলেন, ‘শরিয়া আমাদের সংবিধান ও পাশ্চাত্য মূল্যবোধের প্রতি একটি সরাসরি হুমকি এবং এটি আমাদের আইনব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করে আমাদের মৌলিক স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করতে চায়। আমাদের অভিবাসনব্যবস্থাকে অবশ্যই এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে এবং আমাদের ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধকে রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকতে হবে।’

সর্বশেষ হিসাবে, ককাসটির সদস্যসংখ্যা ৬০ জনের বেশি ছিল। তারা সবাই রিপাবলিকান। গত ডিসেম্বরে ককাসটি গঠনের পর থেকে এর সদস্যরা বেশ কয়েকটি শরিয়াবিরোধী বিল উত্থাপন করেছেন। এসব পদক্ষেপের কোনোটিই সফল হয়নি। কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর ককাসটিকে মুসলিমবিদ্বেষী ঘৃণাবাদী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সিএআইআরের গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি পরিচালক কোরি সেলার বলেন, ‘এই ককাস কর্তৃক ব্যবহৃত গোঁড়ামিপূর্ণ বাগাড়ম্বর সেই ঘৃণারই অনুরূপ, যা ক্যাথলিকবিরোধী রাজনীতিকেরা একসময় আইরিশ-আমেরিকানদের বিরুদ্ধে ছড়িয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইসলাম একটি আমেরিকান ধর্ম, যা ২৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান। যারা সংবিধান রচনা করেছেন বা তারপর থেকে তা প্রয়োগ করেছেন, তাদের কেউই এই আইনপ্রণেতাদের আমেরিকায় কোন ধর্মের অস্তিত্ব থাকবে, তা বেছে নেওয়ার ক্ষমতা দেননি।’

টেক্সাস শরিয়া বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্র

টেক্সাসে শরিয়াবিরোধী বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগস্টে অঙ্গরাজ্যটির অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন ডালাসভিত্তিক ইসলামিক ট্রাইব্যুনালের কাছে নথি তলব করেন। প্রতিষ্ঠানটি মুসলমানদের ধর্মীয় নির্দেশনা দিয়ে থাকে।

প্যাক্সটন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, তার দপ্তরের তদন্তের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাইব্যুনালটি কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত কি না, তা নির্ধারণ করা। এর মধ্যে আদালত হিসেবে কাজ করা, টেক্সাস বা ফেডারেল আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিদেশি আইন প্রয়োগ করা কিংবা সরকারি কর্তৃত্বের ইঙ্গিত দেয় এমন রায় দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।

প্যাক্সটন বলেন, ‘এটা আমেরিকা, এবং আমরা শরিয়া আইন দ্বারা শাসিত হব না।’

এরপর ইসলামিক ট্রাইব্যুনাল ‘উদ্দেশ্য ও কার্যক্রমের স্পষ্টীকরণ’ শিরোনামে একটি বিবৃতি দিয়ে তাদের ওয়েবসাইট হালনাগাদ করে। সেখানে তারা জোর দিয়ে বলে, তাদের নির্দেশনা ‘আমেরিকান সমাজে উপলব্ধ আইনি, সামাজিক ও পেশাগত পরিষেবাগুলোর পরিপূরক, কখনোই সেগুলোর বিকল্প নয়।’

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ট্রাইব্যুনালটি আদালত হিসেবে কাজ করে না এবং আইনত বাধ্যতামূলক কোনো রায় প্রদান করে না। আমাদের ভূমিকা মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের অনুরোধে বিশ্বাস, পারিবারিক নির্দেশনা ও অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কিত মধ্যস্থতা এবং ধর্মীয় সালিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।’

আইনি প্রয়োগের প্রয়োজন এমন যেকোনো বিষয় সরাসরি টেক্সাসের বিচারব্যবস্থায় পাঠানো হয় বলে জানিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তারা তাদের কাজকে ইহুদি বেথ দিন আদালত ও ক্যাথলিক ধর্মীয় ট্রাইব্যুনালগুলোর দেওয়া পরিষেবার সঙ্গে তুলনা করেছে।

মানুষের বোঝাপড়া বাড়াতে চান শরিয়াহ-সমর্থকরা

মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির আইন কলেজের অধ্যাপক আসমা উদ্দিন তার লেখায় যুক্তি দিয়েছেন, অনেক আমেরিকান রাজনীতিক সাধারণ মুসলিম ধর্মীয় রীতিনীতি, যেমন নামাজ, পোশাক নির্বাচন, পারিবারিক পরামর্শ ও মসজিদে উপস্থিতিকে রাজনৈতিক বিপদের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন।

এপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উদ্দিন শরিয়াবিরোধী বক্তব্যের বর্তমান ঢেউকে রাজনীতিকদের তৈরি ভীতিপ্রদর্শন হিসেবে বর্ণনা করেন, যারা নিজেদের সুবিধার জন্য বিষয়টি ব্যবহার করছেন।

তিনি বলেন, ‘যখন রাজনীতিকেরা এটা ব্যবহার করেন, তখন তারা ঠিক সেটাই পান, যা তারা খুঁজছেন। তারা একজন বলির পাঁঠা খুঁজছেন... এবং এতে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।’

সাবিল আহমেদ চলতি বছর এখন পর্যন্ত টেক্সাসে তিনটি প্রচারমূলক সফর করেছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি আরেকটি মসজিদ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হিউস্টন যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এ ছাড়া শরিয়া ও অন্যান্য ইসলামি রীতিনীতি সম্পর্কে খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের বোঝাপড়া বাড়ানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তাদের কাছে পাঠানোর জন্য একটি বই নিয়েও কাজ করছেন তিনি।

সাবিকল আহমেদ বলেন, ‘ইসলামকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মানুষের উচিত একজন মুসলমানের সঙ্গে দেখা করা, মসজিদে যাওয়া, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। আসুন, আমাদের মধ্যে যে মিলগুলো রয়েছে, সেগুলোর ওপর জোর দিই।’