মক্কায় হামলার নেপথ্যে আরব আমিরাত?

পবিত্র নগরী মক্কার কাছে ড্রোন হামলার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে মুসলিম বিশ্ব। চারদিক থেকে আসছে নিন্দার ঝড়। ক্ষমতাধর মুসলিম দেশগুলো কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। পবিত্র নগরীর নিরাপত্তায় প্রয়োজনে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে কোনো কোনো দেশ। তবে হামলার উৎস ও ধ্বংস করা ড্রোনটির ফরেনসিক তথ্যের বিষয়ে এখনও কিছু জানায়নি সৌদি আরব।
রিয়াদের দাবি, চলমান সংঘাতের জেরে সৌদি জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনায় আক্রমণ চালাচ্ছে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি বাহিনী। সেই হামলার অংশ হিসেবে পবিত্র নগরী ‘লক্ষ্যবস্তু করার অপচেষ্টা’ চালিয়েছে তারা। তবে সৌদি আরবের দাবিকে ‘মিথ্যাচার’ আখ্যা দিয়েছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। তাদের দাবি, রিয়াদ কর্তৃপক্ষ বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের ‘সহানুভূতি ও মনোযোগ পেতে’ হুতির ওপর দায় চাপাচ্ছে।
মক্কার কাছে ড্রোন ধ্বংসের সৌদির দাবির পক্ষে প্রমাণিত কোনো তথ্য হাজির করতে পারেনি রিয়াদ। একইসঙ্গে হুতিদের বিরুদ্ধেও তোলা অভিযোগের বিষয়ে স্পস্ট কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। অন্যদিকে হুতি বাহিনীর অভিযোগ, রিয়াদের শাসকরা নগরীতে যৌনকর্মীদের আগমন ঘটিয়ে এর পবিত্রতা নষ্ট করেছে। তাদের দ্বারা এমন মিথ্যাচার করাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে মুসলিম বিশ্ব বিভ্রান্ত হবে না বলে বিশ্বাস করে গোষ্ঠীটি।
উভয়ের একে অপরকে দোষারোপের মধ্যে মক্কায় হামলার নেপথ্যের কারিগর হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে অভিযোগ তীর ছুড়েছে হুতিরা। ইয়েমেনের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরিষদের সভাপতি ও (ডি-ফ্যাক্টো) প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত বলেছেন, যারা জেফ্রি এপস্টেইনকে পবিত্র কাবা শরিফের কিসওয়া (গিলাফ) উপহার দিয়েছিল, তারাই মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘যারা অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনকে পবিত্র কাবা শরিফের কিসওয়া (গিলাফ) উপহার দিয়েছিল, তারাই মক্কা ও মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এই ধরনের দাবিগুলো আর আরব ও মুসলিম দেশগুলোকে ধোঁকা দিতে পারবে না। যেমনটা লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নৌচলাচলের হুমকি নিয়ে করা আগের দাবিগুলোও পারেনি।’
আল-মাশাত বলেন, পবিত্র মুসলিম স্থানগুলোর প্রতি ইয়েমেনি জনগণের গভীর বিশ্বাস ও অঙ্গীকার স্পষ্ট। ইয়েমেনের সমাজের সব শ্রেণির মানুষ গ্র্যান্ড মসজিদের প্রতিরক্ষায় ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। আল-আকসা মসজিদের সমর্থনেও তারা একইভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছে। মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদ ও মদিনার নবীর মসজিদের পর আল-আকসা মসজিদকে ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল-অধিকৃত আল-কুদসের পুরোনো শহরে অবস্থিত পবিত্র স্থানগুলোর অবমাননার প্রতিবাদে ইয়েমেনিরা বিভিন্ন সময়ে রাস্তায় নেমেছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে পবিত্র কোরআন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.), মক্কা এবং আল-আকসা মসজিদ চত্বর।
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের পর জানা যায়, আল-কোরআনের আয়াতখচিত পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ ২০১৭ সালে তার বাসভবনে পাঠানো হয়েছিল। চালানটি সংযুক্ত আরব আমিরাত-সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যবস্থা করা হয়। শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের কাছে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কর্তৃক ৩০ লাখ নথি প্রকাশ করা হয়। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের ইমেইল থেকে জানা যায়, আরব আমিরাতের ব্যবসায়ী আজিজা আল-আহমাদি ও আবদুল্লাহ আল-মারি নামের এক ব্যক্তি কিসওয়ার তিনটি টুকরো পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সৌদি আরব থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে করে কাপড়গুলো প্রথমে ফ্লোরিডায় পাঠানো হয়।
নথি অনুসারে, সেখানে কাস্টমস ও অন্যান্য কাগজপত্র সম্পন্ন করে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সরবরাহ করা হয়। তিনটি টুকরার মধ্যে একটি ছিল কাবার ভেতরের কাপড়, একটি ব্যবহৃত বাইরের আবরণ থেকে নেওয়া, আর একটি একই কাপড়ে তৈরি হলেও আগে ব্যবহার করা হয়নি। অব্যবহৃত টুকরোটিকে কাগজে ‘শিল্পকর্ম’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
২০১৭ সালের মার্চে এই চালানটি এপস্টেইনের বাড়িতে পৌঁছায়। এটা তার কারাভোগ ও যৌন অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হওয়ার অনেক পরের ঘটনা বলে উল্লেখ করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। একটি ইমেইলে আজিজা আল-আহমাদি সরাসরি এপস্টেইনকে লিখে কাপড়টির ধর্মীয় গুরুত্ব বোঝান। তিনি বলেন, ‘কালো কাপড়টি অন্তত এক কোটি মুসলমান স্পর্শ করেছেন, যারা তাওয়াফের সময় এতে তাদের দোয়া, আশা, কান্না ও আকাঙ্ক্ষা রেখে গেছেন।’


