logo

সৌদি মিত্ররা একজোট, হামলা চালিয়ে যাচ্ছে হুতি বিদ্রোহীরা

সৌদি মিত্ররা একজোট, হামলা চালিয়ে যাচ্ছে হুতি বিদ্রোহীরা
আলোচনায় (বাঁ থেকে) পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়েছে মিত্রদেশগুলো। ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় রিয়াদকে কীভাবে সামরিক সহায়তা দেওয়া যায়, তা নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধানেরা। এর আগে হুতিদের ইয়েমেন থেকে নির্মূল না করা পর্যন্ত সেনাদের জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ের কড়া নির্দেশ দেন সৌদি আরবের শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ গ্র্যান্ড মুফতি।

হুতিরা জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবারও তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, হুতিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা মাঝপথেই ধ্বংস করেছে। এর আগে মক্কা, জেদ্দা ও প্রধান তেল বন্দর ইয়ানবুসহ বিভিন্ন এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করেছিল রিয়াদ।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত আগস্টে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে ইতিমধ্যে নিউইয়র্কে বৈঠক করেছেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যেকোনো এক দেশের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ বলেই গণ্য হবে। এ নিয়ে মাঠপর্যায়ের কৌশল নির্ধারণে গতকাল শুক্রবার সৌদি আরব সফরে যান তুরস্কের সেনাপ্রধান জেনারেল সেলসুক বায়রাকতারোগলু। সেখানেই তিন দেশের সেনাপ্রধানেরা আলোচনায় বসার কথা। তবে মক্কা চুক্তি তুরস্কের পার্লামেন্টে এখনো অনুমোদিত না হওয়ায় আঙ্কারার সামরিক সহায়তা আপাতত মূলত দ্বিপক্ষীয় ও কারিগরি সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ তেল বন্দর ইয়ানবু রক্ষায় সেনা ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। গত বৃহস্পতিবার রাতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক দীর্ঘ টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বন্দরটির সুরক্ষায় সেনাসদস্য, রাডার ও আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠানো হলেও এই সামরিক উপস্থিতির উদ্দেশ্য কোনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো নয়।

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রপ্তানি এখন ইয়ানবুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সম্প্রতি বন্দরটিতে হুতিরা হামলা চালানোয় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মাখোঁ নিজ দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত থাকার নিশ্চয়তা দেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে; যদিও হোয়াইট হাউস ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধের খবর অস্বীকার করেছে।

রয়টার্স জানায়, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরানের মতো দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে মুসলিম বিশ্বের জন্য আরও বিস্তৃত একটি জোটে পরিণত হতে পারে বলে গতকাল জানিয়েছেন তুরস্কের পার্লামেন্ট স্পিকার। তিনি আরও বলেন, আগামী মাসে অনুমোদনের জন্য এটি পার্লামেন্টে পেশ করা হতে পারে।

ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় এবং ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবে হামলা চালানোর কয়েক সপ্তাহ আগে আগস্ট মাসে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই হয়। সামরিক জোট ন্যাটোর ধারা ৫-এর মতোই এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, যেকোনো একজন মিত্রের ওপর হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এই চুক্তির মূল রূপরেখা নির্ধারণ এবং রিয়াদের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনায় বৈঠক করে আসছে।

আঙ্কারায় পার্লামেন্ট স্পিকার নুমান কুরতুলমুশ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আন্তর্জাতিক চুক্তি কার্যকর হওয়ার জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। এই চুক্তির অংশ হিসেবে বর্তমানে যেসব বৈঠক হচ্ছে, সেগুলো প্রস্তুতিমূলক বৈঠক।’ অক্টোবরে পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি আশা করছি, আগামী মেয়াদে বিষয়টি পার্লামেন্টের এজেন্ডায় আসবে।’

চুক্তিটি ইরানের বিরুদ্ধে কি না—জানতে চাইলে কুরতুলমুশ আঙ্কারার অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, এই চুক্তি নির্দিষ্ট কোনো দেশকে নিশানা করে করা হয়নি। সংঘাত ও ইসরায়েলের ‘শত্রুতাপূর্ণ নীতির’ মধ্যে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূলত এর প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি আরও যোগ করেন, তেহরানও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে এই জোটে যোগ দিতে পারে।

কুরতুলমুশ বলেন, ‘আমরা মক্কা চুক্তিকে কখনোই ইরানের বিরুদ্ধে কোনো জোট হিসেবে দেখি না, এমনটা হওয়াও উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা আশা করি, মক্কা চুক্তিটি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি আরও বিস্তৃত জোটে পরিণত হতে পারে। ইরানও এই চুক্তিতে যোগ দিতে পারে; আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের অংশগ্রহণে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে আমরা আশা করি।’

সংঘাতের মধ্যেই নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চলেছে। বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হুতিদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, হুতিদের কর্মকাণ্ডের দায়ভার তাদের নিজেদের।

ইরানে গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন–ইসরায়েলি হামলার পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান। ওই প্রাণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল একেবারেই সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে জ্বালানি নিয়ে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবার আলোচনা শুরুর সম্ভাবনায় শুক্রবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। এদিকে ওয়াশিংটন ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ জারি করে ইরানের সঙ্গে যুক্ত তৃতীয় দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নিশানা করেছে। এর জেরে বৃহস্পতিবার থেকেই সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে ইরানি বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়।

সূত্র: প্রথম আলো