logo

ইসরায়েলি চিকিৎসকদের দেশ ছাড়ার হিড়িক

হারেৎজ
হারেৎজ
ইসরায়েলি চিকিৎসকদের দেশ ছাড়ার হিড়িক
ইসরায়েলি হাসপাতালে কাজ করছেন একজন চিকিৎসক। ছবি: হারেৎজ

গাজা যুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েল থেকে চিকিৎসকদের দেশত্যাগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩৭০ জন চিকিৎসক ইসরায়েল ছেড়েছেন। এক দশক আগের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।

Advertisement

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। রোববার ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ গবেষণাটির ফল প্রকাশ করে।

গবেষকদের মতে, চিকিৎসকদের দেশত্যাগের বড় মোড় আসে ২০২৩ সালে। ওই বছর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দেশটিতে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। একই বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

গবেষণায় ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর সংজ্ঞা অনুসরণ করা হয়েছে। কোনো চিকিৎসক দেশত্যাগ করেছেন বলে ধরা হয়েছে, যদি দেশ ছাড়ার পর প্রথম বছরে তিনি ২৭০ দিনের বেশি বিদেশে থাকেন এবং পরে টানা তিন মাসের বেশি ইসরায়েলে অবস্থান না করেন।

গবেষকেরা এমন ব্যক্তিদেরও হিসাব থেকে বাদ দিয়েছেন, যারা ইসরায়েলে আসার পর তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশ ছেড়েছেন। এর ফলে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইসরায়েলে আসা অভিবাসীদের অনেকে পরে দেশ ছাড়ার কারণে যে পরিসংখ্যানগত বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, তা এড়ানো হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সময়ে গড়ে প্রতি বছর ২৫৫ জন চিকিৎসক ইসরায়েল ছেড়েছেন। আগের দশকে এই বার্ষিক গড়ের তুলনায় তা প্রায় পাঁচ গুণ।

চিকিৎসকদের বয়সের দিক থেকেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সী চিকিৎসকদের মধ্যে দেশত্যাগের হার বেড়েছে। গত তিন বছরে ইসরায়েল ছেড়ে যাওয়া চিকিৎসকদের প্রতি পাঁচজনের একজনের বয়স ছিল অন্তত ৪৫ বছর। আগের দশকে এই অনুপাত ছিল প্রায় সাতজনে একজন।

৪৫ বছরের বেশি বয়সী চিকিৎসকদের দেশত্যাগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকেরা। কারণ, এই বয়সের চিকিৎসকদের বেশির ভাগই বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ শেষ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

বিশেষায়িত চিকিৎসা ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। কান-নাক-গলা, চর্ম ও চক্ষু চিকিৎসকদের মধ্যে ১১৬ জন ইসরায়েল ছেড়েছেন। এসব বিভাগে কর্মরত মোট চিকিৎসকের ৬ দশমিক ২ শতাংশ এই সময়ে দেশত্যাগ করেছেন। ৬০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে এই হার আরও বেশি—৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

সার্জনদের (শল্যচিকিৎসক) ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৮৮ জন সার্জন ইসরায়েল ছেড়েছেন, যা এই বিভাগের মোট চিকিৎসকের ৬ শতাংশ। ৬০ বছরের কম বয়সী সার্জনদের মধ্যে দেশত্যাগের হার ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

জেলাভিত্তিক হিসাবে চিকিৎসকদের দেশত্যাগের হার সবচেয়ে বেশি তেল আবিব এলাকায়। সেখানে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ চিকিৎসক দেশ ছেড়েছেন। বিপরীতে পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলোতে এই হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ।

চিকিৎসকদের দেশত্যাগের সঙ্গে ইসরায়েলের অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধিও নতুন চাপ তৈরি করছে। গত সপ্তাহে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী কয়েক বছরে সরকারি হাসপাতালগুলোর প্রায় ২৪ শতাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অবসরের বয়সে পৌঁছাবেন। এ ছাড়া বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসকদের প্রায় ২৫ শতাংশ ইতোমধ্যে অবসরের বয়স পার করেছেন। চিকিৎসক সংকটের কারণে তাদের অনেকেই এখনো কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

গবেষণার অন্যতম গবেষক ইতাই আতার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে চিকিৎসকদের দেশত্যাগের ধারাবাহিকতাই বেশি উদ্বেগের। তার মতে, আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশত্যাগের এই প্রবণতা পরিবর্তিত না হলে বর্তমানে যে ক্ষতি দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে তার প্রভাব আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের আগের গবেষণাগুলোতেও ২০২৩ সালের পর ইসরায়েল থেকে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের দেশত্যাগ বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদেরা বিশেষ করে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদসহ দক্ষ কর্মীদের দেশ ছাড়ার বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক করে আসছিলেন।

চিকিৎসকদের পাশাপাশি সামগ্রিক জনসংখ্যার মধ্যেও ইসরায়েল ছাড়ার প্রবণতা বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আগস্টে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় বলা হয়, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত তিন মাসের জন্য ২ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৯ জন ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছেন। দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান এটিকে রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ইসরায়েলি বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশত্যাগ বৃদ্ধির পেছনে গাজা যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগকে ঘিরে রাজনৈতিক সংকটের কথা বলা হয়েছে।