জাপানি ইয়েনকে কেন টেনে তুলতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

বিগত ৪০ বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা জাপানি মুদ্রা ইয়েনকে টেনে তুলতে নতুন করে পদক্ষেপ নিয়েছে আমেরিকা। মুদ্রাটির অস্বাভাবিক দরপতন ঠেকাতে যৌথভাবে কাজ করছে টোকিও ও ওয়াশিংটন। দুই দেশের এই যৌথ পদক্ষেপে বিশ্ববাজারে ইয়েনের মান অনেকটাই বেড়েছে।
চীনা আর্থিক ডেটা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘উইন্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, টোকিও ও ওয়াশিংটনের যৌথ উদ্যোগের পর সোমবার (৩ আগস্ট) লেনদেনের শুরুতে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মান বেড়ে দাঁড়ায় ১৫৫ দশমিক ২৩-এ। এ হিসাব চলতি বছরের মে মাসের পর মুদ্রাটির সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থান।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে তার কার্যবিবরণী তুলে ধরেন। কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করেন, স্বয়ং আমেরিকা ৫ বিলিয়ন থেকে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের ইয়েন কেনার পরিকল্পনা করছে।
রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পদক্ষেপকে ‘বন্ধুত্বের প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, আমেরিকা সবসময় জাপানের পাশে রয়েছে। একই সময়ে ট্রেজারি সচিব বেসেন্টও জানান, প্রয়োজনে আরও যৌথ পদক্ষেপ নিতে ওয়াশিংটন দ্বিধা করবে না।
সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালের পর ইয়েন শক্তিশালী করতে আমেরিকা ও জাপানের এটাই প্রথম যৌথ হস্তক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, মার্কিন প্রশাসন হঠাৎ কেন জাপানি মুদ্রাকে চাঙা করতে এগিয়ে এলো?
যে কারণে এই যৌথ হস্তক্ষেপ
চায়না সিকিউরিটিজের প্রধান অর্থনৈতিক বিশ্লেষক কিয়ান উই জানান, এই পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনে কৌশলগত কারণ রয়েছে। ডলারের বিপরীতে দরপতন ঠেকাতে টোকিও একটি সঠিক সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ওপর চাপ কমানো।
কিয়ান জানান, জুলাইয়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার অপরিবর্তিত রাখায় ডলার কিছুটা দুর্বল হয়। ঠিক সেই সময়ে ইয়েন মাত্রাতিরিক্ত অবমূল্যায়িত হচ্ছে বলে মার্কিন ট্রেজারি সচিব প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এতে টোকিওর ওপর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ কমে যায় এবং তারা মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পায়।
সাধারণত নিজেদের মুদ্রাকে চাঙা করতে জাপানকে মার্কিন ডলারের সম্পদ (যেমন মার্কিন বন্ড) বিক্রি করে ইয়েন কিনতে হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডে বড় ধরনের বিক্রির চাপ সৃষ্টি হতে পারত। মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, জাপানকে সরাসরি ইউরো বিক্রি করে ইয়েন কেনার সুযোগ তৈরি করে দিতে আমেরিকা নিজে থেকে এই বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। ফলে মার্কিন বন্ড সুরক্ষিত রইল, আবার ইয়েনের মানও বাড়ল।
পরে যা ঘটতে পারে
হংকংয়ের সিসিবি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লিফ ঝাও জানান, ইয়েন যদি আবারও মারাত্মক দরপতনের মুখে পড়ে, তবে আবার এমন পদক্ষেপ দেখা যেতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়মিতভাবে এমন হস্তক্ষেপ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং আমেরিকার পক্ষে নিয়মিত তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণে ইয়েন সাময়িকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই মুদ্রার ঊর্ধ্বমুখী গতি ধরে রাখা কঠিন হবে। ব্যাংক অব ইস্ট এশিয়ার কৌশলবিদ বসকো উ জানান, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রতি মার্কিন ডলারে ইয়েনের বিনিময় হার ১৫৫ থেকে ১৬০-এর মধ্যে ওঠানামা করতে পারে। কারণ, আমেরিকা ও জাপানের মধ্যকার সুদের হারের বড় ব্যবধান এখনও বর্তমান।
শেয়ার ও মুদ্রাবাজারে প্রভাব
ইয়েন শক্তিশালী হওয়ায় বিশ্ব শেয়ারবাজারে যে অস্থিরতার আশঙ্কা করা হয়েছিল, বিশ্লেষকরা তা উড়িয়ে দিচ্ছেন। বসকো উ বলেন, দুই বছর আগে ইয়েনের দাম এক লাফ বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ঋণ শোধ করতে তাড়াহুড়ো করে শেয়ার বিক্রি করেছিলেন। এবার বাজার আগে থেকে সতর্ক থাকায় সেই ধরনের বিশৃঙ্খলার সুযোগ কম।
অন্যদিকে, চীনা বাজারের ক্ষেত্রে হংকংয়ের বাজার কিছুটা সংবেদনশীল হতে পারে। সাময়িকভাবে হংকংয়ের বাজারে তারল্য সংকট দেখা গেলেও চীনের মূল ভূখণ্ডের শেয়ারবাজারে এর প্রভাব হবে খুবই সীমিত। তবে ইয়েন চাঙা হওয়ার ফলে যেসব চীনা প্রতিষ্ঠান জাপানে পণ্য রপ্তানি করে, তারা লাভবান হবে। সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য এটি স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি হলেও মূল বাজার ধারায় বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।


