logo

ফ্রান্সে নজিরবিহীন সহিংসতা, গ্রেপ্তার ২৪০০; শান্ত থাকার আহ্বান ম্যাক্রোঁর

বিবিসি
বিবিসি
ফ্রান্সে নজিরবিহীন সহিংসতা, গ্রেপ্তার ২৪০০; শান্ত থাকার আহ্বান ম্যাক্রোঁর
রোববার প্যারিসে বিশৃঙ্খলার সময় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়। ছবি: বিবিসি নিউজ

ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ থেকে সহিংস দাঙ্গা ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ার পর দেশবাসীকে শান্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। শনিবারের বিক্ষোভের পর রোববারও রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও অস্থিরতা অব্যাহত ছিল।

এলিসি প্রাসাদ থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রোঁ বিক্ষোভকারীদের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ক্ষুব্ধ এবং লজ্জিত।’

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্কুলসহ বিভিন্ন জনসেবার মানের অবনতির প্রতিবাদে শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। বিক্ষোভের বড় অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও একপর্যায়ে বিভিন্ন শহরে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাট শুরু হয়।

ম্যাক্রোঁ বলেন, বিক্ষোভকারীদের ‘যৌক্তিক দাবির’ সঙ্গে যারা ভাঙচুর, ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট চালিয়েছে, তাদের কর্মকাণ্ডকে এক করে দেখা যাবে না। তিনি বলেন, ‘কোনো কিছুই এই লাগামহীন সহিংসতাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।’ সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সহিংসতা

কালো পোশাক পরা এবং মুখোশ ও বালাক্লাভায় মুখ ঢাকা দাঙ্গাকারীরা প্যারিস, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষে জড়ায়। কোথাও কোথাও গাড়ি ও ভবনে আগুন দেওয়া হয়। প্যারিস ও লিওঁর কিছু এলাকায় রোববারও লুটপাট এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যদিও আগের দিনের তুলনায় তা ছিল সীমিত।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিসে কয়েক শ মানুষের সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে। বিক্ষোভকারীরাও পুলিশের দিকে বোতল ও পাথর নিক্ষেপ করেন।

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠক করবেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু।

আগুনে পুড়ে ধ্বংস ঐতিহাসিক সিটি হল

সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে লিমোজ শহরে। শনিবার দাঙ্গাকারীদের লাগানো আগুনে শহরটির ১৯ শতকের ঐতিহ্যবাহী সিটি হলের বড় অংশ পুড়ে যায়। আগুনের তীব্রতায় ভবনটির ঘড়ির টাওয়ার ও ছাদ ধসে পড়ে।

ধ্বংসস্তূপের কাছে দাঁড়িয়ে অ্যানেইসে নামের এক নারী বলেন, ‘এটি অত্যন্ত কষ্টের। সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ঐতিহ্যবাহী ভবন ধ্বংস করা স্বার্থপরতার পরিচয়। এতে সবারই ক্ষতি হচ্ছে।’

জেরার্ড নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘এটি ভয়াবহ ও অবিশ্বাস্য। আমরা খুবই দুঃখিত। ভবনটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লাগবে।’

এদিকে রোববার সকালে প্যারিসের বিভিন্ন দোকানের সামনে ছড়িয়ে থাকা কাচের বড় বড় টুকরা পরিষ্কার করতে দেখা যায় দোকানিদের। প্রধান সড়কগুলো থেকে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নিতে কাজ করেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও।

প্যারিস, মার্সেই ও লিলসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে।

নিরাপত্তা জোরদার ও পুলিশের ভূমিকা তদন্তের আশ্বাস

দোকানপাট ও সরকারি ভবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও মেয়রদের নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ম্যাক্রোঁ। একই সঙ্গে বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ‘পূর্ণ স্বচ্ছতা’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

সপ্তাহান্তজুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা পুলিশের সদস্যদের লাঠি দিয়ে মানুষকে আঘাত করতেও দেখা গেছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, শনিবার প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা গুরুতর।

রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট

গত মাসে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শনিবার আরও তীব্র রূপ নেয়। ওই দিন শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য ও অন্যান্য সরকারবিরোধী গোষ্ঠীও আন্দোলনে যোগ দেয়।

আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী ও কট্টর বামপন্থী শক্তির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, বিক্ষোভ করা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। তবে তার অভিযোগ, কয়েক হাজার কট্টর বামপন্থী ব্যক্তি সরকারি ভবনকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর উদ্দেশ্যে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় অপরাধী চক্র, যারা বিভিন্ন শহরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়।

তবে বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশপ্রধানদের ‘সম্পূর্ণ অযোগ্যতা’র অভিযোগ তুলে তাদের ‘পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে বিশেষজ্ঞ’ বলে কটাক্ষ করেন।

অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি দলের নেতা মারিন ল্য পেন সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, কিছু রাজনৈতিক শক্তি মানুষের ক্ষোভকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার যখন নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বিক্ষোভকারীদের দাবিদাওয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আসন্ন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা দেশটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।